বিশ শতকের শুরুর সময়। বাংলা পাক ভারত উপমহাদেশের আকাশে তখন পালাবদলের মেঘ। একদিকে ব্রিটিশবিরোধী রাজনীতির উত্তাপ, অন্যদিকে মুসলিম মানসে নিজেদের অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখার লড়াই। ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে বাংলার ইতিহাসে ঘটল এক অভূতপূর্ব মিলন। একদিকে ঢাকার প্রতাপশালী নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ বাহাদুর, যার ইশারায় তখন পূর্ব বাংলার রাজনীতি আবর্তিত হয়; অন্যদিকে সমাজসংস্কারক, সফল লেখক, নিভৃতচারী আধ্যাত্মিক সাধক, হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)। আপাতদৃষ্টিতে তারা ছিলেন ভিন্ন দুই ভুবনের বাসিন্দা।
১৯০৯ সালের নভেম্বর মাস। নবাবের আমন্ত্রণে মোগল ঐতিহ্যের শহর ঢাকায় পা রাখলেন মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)। কিন্তু কেন? একজন রাজসিক শাসকের সঙ্গে একজন দরবেশের এই সখ্য কি নিছকই সৌজন্য ছিল, নাকি এর নেপথ্যে লুকিয়ে ছিল বাংলার মুসলিম রেনেসাঁর এক সুদূরপ্রসারী নকশা?
রাজদণ্ড যেখানে আধ্যাত্মিকতার সামনে আনত হয়, আভিজাত্য যেখানে মিশে যায় রুহানিয়াতের মোহনায়—সেই বিরল ইতিহাসের সাক্ষী হতে আপনাদের আমন্ত্রণ। রাজনীতির মাঠ আর খানকার নির্জনতা কীভাবে এক বিন্দুতে মিলে পাল্টে দিয়েছিল উপমহাদেশের ইতিহাসের গতিপথ, সেই রোমাঞ্চকর উপাখ্যানের দুয়ার আজ আমরা খুলব। চলুন, ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে ফিরে দেখা যাক সেই গৌরবোজ্জ্বল সফরের দাস্তান, যা আজও আমাদের শেকড়ের সন্ধান দেয়। আজ আমরা ফিরে দেখব ইতিহাসের সেই সোনালি অধ্যায়, যখন ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহর আমন্ত্রণে এক আধ্যাত্মিক পুরুষ পা রেখেছিলেন মোগল ঐতিহ্যের শহর ঢাকায়।
নির্জনতাপ্রিয় এক আধ্যাত্মিকপুরুষের সফরনামা
স্বভাবগতভাবেই থানভী (রহ.) ছিলেন নির্জনতাপ্রিয় একজন মানুষ। কোলাহল, জনসমাগম আর লৌকিকতা ছিল তার স্বভাববিরুদ্ধ। আল্লাহওয়ালা সুফি-সাধকদের মতো তিনিও নির্জনে বসে স্রষ্টার ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। তার জীবনীকার খাজা আজিজুল হাসান মাজজুব লিখেছেন, ‘হজরতের কাছে সফরের আবেদন আসত প্রচুর, কিন্তু তিনি ভিড়ভাট্টা আর মামুলাত (দৈনন্দিন ওজিফা) আদায়ে ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কায় সচরাচর সফর এড়িয়ে চলতেন।’
তবুও তিনি ছিলেন শরিয়তের বিদগ্ধ পাহারাদার। উম্মাহর সংশোধন বা ‘ইসলাহ’-এর ফিকির তাকে খানকার চার দেয়ালের মাঝে আটকে রাখতে পারেনি। দাওয়াতে দ্বীন, হজ-উমরা এবং রুগ্ণ ও বিপদগ্রস্তদের সান্ত্বনা দিতে তিনি উপমহাদেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন।
নবাবের দরবার থেকে আমন্ত্রণ এবং হজরতের কঠিন শর্ত
তখনকার ঢাকা আজকের মতো জনাকীর্ণ না হলেও ঐতিহ্যে ভরপুর ছিল। ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ, আলেমভক্ত ও আধ্যাত্মিকতাপ্রিয় একজন শাসক। তার মনের প্রবল ইচ্ছা ছিল, উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক জগতের মুকুটহীন সম্রাট থানভী (রহ.) কে ঢাকায় আনবেন। কিন্তু কাজটা সহজ ছিল না। হজরত থানভী সাধারণত রাজা-বাদশাহ, ক্ষমতাধর বা বিত্তবানদের সঙ্গ এড়িয়ে চলতেন। তবুও নবাব সাহেবের পীড়াপীড়ি এবং আন্তরিকতা দেখে তিনি দাওয়াত কবুল করলেন, তবে জুড়ে দিলেন কঠিন কিছু শর্ত। শর্তগুলো ছিল—
১. কোনো নগদ অর্থ বা উপঢৌকন-হাদিয়া দেওয়া যাবে না।
২. নবাবের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য একান্ত কিছু সময় নির্ধারণ করতে হবে, যেখানে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি থাকবে না।
৩. বসবাসের ব্যবস্থা প্রাসাদের জাঁকজমকের বাইরে এমন স্থানে হতে হবে, যেখানে সাধারণ মানুষ বিনা বাধায় যাতায়াত করতে পারে।
৪. কোনো বিশেষ বিষয়ে ওয়াজ বা বক্তৃতা করার জন্য জোরাজুরি করা যাবে না।
নবাব সলিমুল্লাহ ছিলেন স্বচ্ছ হৃদয়ের মানুষ। তিনি হজরতের সব শর্ত বিনা বাক্যে মেনে নিলেন। শুরু হলো উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক রাহবারের ঢাকায় বরণ করে নেয়ার প্রস্তুতি।
রাজকীয় সংবর্ধনা বনাম সুন্নতি অনাড়ম্বরতা
নবাব সলিমুল্লাহর ইচ্ছা ছিল, ব্রিটিশ ভাইসরয়কে যেভাবে রাজকীয় সংবর্ধনা দেওয়া হয়, হাকিমুল উম্মতকে তিনি ঠিক সেভাবেই বরণ করে নেবেন। রেলস্টেশনে বিছানো হবে মখমলের কার্পেট, থাকবে চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা, বাজবে ব্যান্ড পার্টি। কিন্তু এই আয়োজনের খবর কোনোভাবে হজরত থানভীর কানে পৌঁছে গেল। তিনি তৎক্ষণাৎ পত্র লিখে জানালেন, ‘এসব অনর্থক ও শরিয়তবিরোধী আয়োজন আমার স্বভাববিরুদ্ধ। এমন হলে আমি সফর বাতিল করতে বাধ্য হব।’
নবাব সাহেব অনুমতি চাইলেন অন্তত সরকারি কর্মকর্তা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে একটি দলসহ তাকে অভ্যর্থনা জানাতে। থানভী (রহ.) তাতেও অসম্মতি জানালেন। শেষমেষ কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই তিনি ঢাকায় পৌঁছালেন। তবে আনুষ্ঠানিকতা না থাকলেও স্টেশনে নেমেছিল ভক্তদের ঢল । নবাব সলিমুল্লাহ নিজে স্টেশনে উপস্থিত হলেন, কিন্তু আদব রক্ষার্থে হজরতের গাড়িতে না উঠে অন্য একটি গাড়িতে চড়ে তাকে অনুসরণ করলেন। এটি ছিল একজন শাসকের পক্ষ থেকে একজন আলেমের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের বিরল দৃষ্টান্ত।
দস্তরখানে আধ্যাত্মিকতা ও নবাবের আতিথেয়তা
ঢাকায় অবস্থানকালে হজরত থানভীর খেদমতে নবাব সলিমুল্লাহ কোনো ত্রুটি রাখেননি। তিনি চূড়ান্ত পর্যায়ের আদবের প্রতি লক্ষ্য রেখে থানভী (রহ.) র সঙ্গে এক দস্তরখানে বসে খেতেন না। নবাবের বাসা থেকে প্রতিবেলায় শাহি খাবার আসত এবং নবাব নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তা পরিবেশন করতেন।
একদিন খাবারের সময় একটি চমকপ্রদ ঘটনা ঘটল। নবাব সাহেব পরম যত্নে বিভিন্ন পদের খাবার পরিবেশন করছিলেন এবং পরিচিতি দিচ্ছিলেন—‘হুজুর, এটি আমার অমুক বিবি রেঁধেছেন, এটার নাম এই...।’ একপর্যায়ে তিনি হজরতকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই তরকারিটার নাম বলুন তো!’
হাকিমুল উম্মত তখন স্বভাবসুলভ রসবোধ মিশিয়ে উত্তর দিলেন, ‘খাবার খেতে হলে কি তার নাম জানতে হয়? খাবারের স্বাদ তো মুখে দিলেই পাওয়া যাচ্ছে। আর যদি আপনার নীতি এমন হয় যে, খাওয়ার আগে নাম জানতেই হবে, তবে আপনার খাবারের আমার কোনো প্রয়োজন নেই।’
এই কথা শুনে নবাব সাহেব লজ্জিত হলেন এবং এর পর থেকে নিজেই সব খাবারের পরিচয় তুলে ধরতেন।
‘আমি আপনাকে মুরিদ করব না’
এই সফরের সবচেয়ে শিক্ষণীয় দিক ছিল, নবাব সাহেবের বিনয় ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি আগ্রহ। এত বড় একজন নবাব, যিনি অবস্থান করছেন ক্ষমতার শীর্ষে এবং অঢেল সম্পদের মালিক, তিনি হযরতের কাছে ‘বাইআত’ (শিষ্যত্ব গ্রহণ) হওয়ার আকুতি জানালেন। সাধারণ কোনো ব্যক্তি হলে হয়তো এই সুযোগ লুফে নিতেন। কিন্তু থানভী (রহ.) সাফ জানিয়ে দিলেন, ‘আমি আপনাকে মুরিদ করব না।’
কারণ হিসেবে তিনি যা বললেন তা ছিল প্রজ্ঞা ও তাৎপর্যে পরিপূর্ণ। তিনি বললেন, ‘রাজা-বাদশাহ বা ক্ষমতাসীনদের মুরিদ করে লাভ নেই। কারণ আত্মশুদ্ধির পথে পীরকে কখনো কখনো মুরিদকে ধমক দিতে হয়, কড়া কথা বলে সংশোধন করতে হয়। কিন্তু যাদের দুনিয়াবি কারণে খাতির করে চলতে হয়, তাদের পূর্ণাঙ্গ ইসলাহ করা সম্ভব নয়।’
নবাব সাহেব এতে মনঃক্ষুণ্ণ হলেন না। বরং হজরতের প্রতি তার শ্রদ্ধা আরো বেড়ে গেল। তিনি আমৃত্যু চিঠিপত্রের মাধ্যমে হজরতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং নিজেকে ‘আপনার মুরিদ সলিমুল্লাহ’ হিসেবে পরিচয় দিতেন।
বাংলার মাটিতে থানভীর রুহানি উত্তরাধিকার
হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর ঢাকা সফর এবং বাংলার সঙ্গে তার সম্পর্ক নিছক একটি ভ্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এই সফরের সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছিল বাংলার মুসলিম সমাজের ওপর। নবাব সলিমুল্লাহর মতো প্রভাবশালীদের দ্বীনমুখী হওয়া ছিল সেই প্রভাবেরই অংশ। আজকের বাংলাদেশে মাদরাসা ও দ্বীনি শিক্ষার যে ব্যাপক প্রসার আমরা দেখছি, তার শেকড় সন্ধানে গেলে আমাদের বারবার ফিরে যেতে হবে হাকিমুল উম্মতের সেই রুহানি পরশ ও ঐতিহাসিক সফরের কাছে।