ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতাসংগ্রাম
সমসাময়িক কালে বরিশাল এলাকার প্রাচীন ইতিহাস খুব একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। সমতল ও নদীবেষ্টিত ভূপ্রকৃতির কারণে এখানে নদীভাঙনে জনবহুল জনপদ বিলীন হয়ে যাওয়া নিত্যদিনের ঘটনা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের স্বল্পতা, জলোচ্ছ্বাস এবং জোয়ার-ভাটার প্রভাবে পলি-আচ্ছাদিত ভূভাগের ক্রমাগত রূপান্তর। ফলে এই অঞ্চলের প্রাচীনত্ব অনেক সময় সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা যায় না। নদীর প্রবল স্রোতে গ্রাম-জনপদ ভেঙে পড়ে, আবার কোথাও নতুন চর জেগে ওঠে; আবাদ শুরু হয় এবং গড়ে ওঠে নতুন বসতি। এই পরিবর্তনশীলতার মধ্য দিয়েই বরিশালের জনজীবন অবিরাম অগ্রসর হচ্ছে।
প্রাচীন বরিশালের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক হয়ে যেসব স্থাপনা এখনো অক্ষত আছে, কড়াপুর মিয়াবাড়ি মসজিদটি তার অন্যতম। এ মসজিদ শুধু নান্দনিক নকশার জন্য নয়, বরং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবেও সুপরিচিত।
বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের সূচনাপর্বে বিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও মসজিদটি মোগল স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত। মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন মালদার খাঁর ছেলে, চন্দ্রদ্বীপ রাজার সেনাবাহিনীর বাঙালি মুসলিম সেনাপতি, বরিশালের বুজুর্গ-উমেদপুর পরগণার শক্তিশালী জমিদার এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিপত্যবিরোধী প্রতিরোধ যোদ্ধা হায়াত মাহমুদ। তার জীবন বেশ বৈচিত্র্যময়। প্রাথমিক জীবনে তিনি ছিলেন চন্দ্রদ্বীপের সৈন্যবাহিনীর একজন সদস্য। সেখানে তিনি সেনাপতি হন এবং বুজুর্গ-উমেদপুরসহ কয়েকটি পরগনার জমিদারি লাভ করেন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা দখল করলে তাদের আধিপত্য মানতে তিনি অস্বীকার করেন। ফলে তাকে ‘ডাকাত সরদার’ ঘোষণা করে তার জমিদারি কেড়ে নেওয়া হয় এবং গ্রেপ্তার করে প্রিন্স অব ওয়েলস দ্বীপে নির্বাসনে পাঠানো হয়। দীর্ঘদিন তিনি নির্বাসনে কাটান। এরপর দেশে ফিরে এসে (বর্তমান) কড়াপুরে বসতি স্থাপন করেন। সেসময় তিনি এই মসজিদটি নির্মাণ করেন।
মসিজিদটির নির্মাণ সন ধরা হয় আনুমানিক ১৮ শতকের একেরারে শেষ বর্ষ। দৃষ্টিনন্দন দোতলা এই মসজিদটি শায়েস্তাখানি স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, তাজমহল নির্মাণকারী কিছু কারিগর এই মসজিদ নির্মাণে শ্রম ব্যয় করেছিলেন। ১৭ শতকে নির্মিত অনেক মসজিদের স্থাপত্যরীতির সঙ্গে এই মসজিদের যথেষ্ট মিল রয়েছে।
শায়েস্তাখানি নির্মাণশৈলীর এই মসজিদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৭০ ফুট এবং প্রস্থ ৪০ ফুট। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, ছাদে কোনো ধরনের রড কিংবা লোহা ব্যবহার করা হয়নি। ইট, সুরকি ও চুনের মিশ্রণে তৈরি ছাদের পুরুত্ব প্রায় এক ফুট। দোতলা এই মসজিদের নিচতলার দেয়ালের পুরুত্ব ৪০ ইঞ্চি এবং দোতলার দেয়ালের পুরুত্ব ৩০ ইঞ্চি। দোতলায় ওঠার জন্য বাইরে একটি প্রশস্ত সিঁড়ি রয়েছে। মসজিদের দোতলায় রয়েছে তিনটি দরজা ও আটটি বড় মিনার। বড় মিনারগুলোর মধ্যে আরো ১২টি ছোট মিনার রয়েছে। মসজিদের মাঝখানে রয়েছে তিনটি গম্বুজ। মসজিদের সিঁড়ির নিচে রয়েছে দুটি বাঁধানো কবর। তবে এ দুটি কবর কার, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। মসজিদটিতে একসঙ্গে ৫৫-৬০ জন ব্যক্তি নামাজ আদায় করতে পারেন। বর্তমানে মসজিদের নিচতলায় কয়েকটি কক্ষে মাদরাসার কার্যক্রম চলছে। সম্প্রতি মসজিদটির সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য সংস্কার করা হয়েছে।
স্থানীয় উদ্যোগে নির্মিত ‘কড়াপুর মিয়াবাড়ি মসজিদ’ বরিশালে মুসলিম জনবসতি ও আধিপত্যবাদী শক্তির কাছে মাথানত না করার সবক নিয়ে এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।