প্রাচ্যের রানিখ্যাত চট্টগ্রাম বাংলাদেশ তথা এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী এবং প্রত্নসম্পদসমৃদ্ধ এক সুপ্রাচীন জনপদ। বৌদ্ধদের চৈত্যগ্রাম, হিন্দুদের চট্টল, মুসলমানদের শাৎগাঙ বা চাটিগাঁ, আরাকানিদের চিৎ-তৎ-গং (Tsit-Tat-Gung), পাঠানদের ফতেহাবাদ, মোগলদের ইসলামাবাদ, পর্তুগিজদের চাটিগাম (Xetigam) বা পোর্টো গ্রান্ডো, ইংরেজদের চিটাগং (Chittagong) এবং পরবর্তীকালের ‘চট্টগ্রাম’—ইতিহাসের বহু ঘটনা ও বাঁক পরিবর্তনের অনুঘটক। নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর ও চব্বিশ পরগনার চন্দ্রকেতুগড় বাংলাদেশের ইতিহাসকে খ্রিষ্টপূর্ব দেড় হাজার বছর আগে পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। পর্যটক Strabo-এর বর্ণনা থেকে মনে হয়, খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকেও চট্টগ্রাম একটি আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর ছিল। (চট্টগ্রামের ইতিহাস, আহমদ শরীফ, পৃষ্ঠা : ১২) সে হিসেবে চট্টগ্রামের প্রাচীনত্ব কত বিস্তৃত, তা বলা মুশকিল। তবে কিছু বিষয় বিবেচনায় বিদগ্ধজনরা মনে করেন, চট্টগ্রাম এর চেয়েও বেশি প্রাচীন।
প্রাগৈতিহাসিক যুগের দলিল : পেরিপ্লাস অব দ্য ইরিথ্রিয়ান সি-এর স্কেচচিত্রে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের চিহ্ন সুস্পষ্ট। প্রাচীন গ্রন্থ শুক্লযজুর্বেদে গণ্ডকী নদীর পূর্বদিকে বিস্তৃত নীল সাগরের অথৈ জলের ওপর দিয়ে চট্টগ্রামের পর্বতমালার শীর্ষদেশ দৃষ্টিগোচর হতো বলে উল্লেখ রয়েছে। মহাভারতে বর্ণিত কিরাত রাজ্য বা গ্রিক পর্যটকদের উল্লিখিত কিরাদি রাজ্য যে চট্টগ্রাম, তা ম্যাকক্রিন্ডল ও পার্জিটারের মতো পণ্ডিতরাও স্বীকার করেন। তিব্বতীয় বৌদ্ধ ঐতিহাসিক লামা তারানাথের মতে, চন্দ্র রাজবংশীয় রাজাদের রাজধানী ছিল চট্টগ্রাম। আরাকানের সিথাং মন্দিরের শিলালিপিতে এই রাজবংশকে দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষমতাশালী রাজবংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতটুকু ছিল নিকট অতীতের কথা। দূর-অতীত তথা আদিম যুগের বিষয়ে একটু বলি। ভূতাত্ত্বিকদের গবেষণায় দেখা গেছে, গাঙ্গেয় বদ্বীপের বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল নবীন পলিমাটিতে গঠিত হলেও চট্টগ্রামসহ বেশ কিছু অঞ্চল গড়ে উঠেছিল প্রায় ১০ লাখ বছর আগে, ভূভাগ উৎক্ষিপ্ত হওয়ার সময়কাল—প্লাইস্টোসিন যুগে। (বাংলাদেশের প্রত্নবস্তু : প্রাচীন যুগ, দিলরুবা শারমিন, পৃষ্ঠা : ১৬)
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড চন্দ্রনাথ পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় ১৮৮৬ সালে পাওয়া প্রাগৈতিহাসিক যুগের অশ্মীভূত কাঠের ‘কৃপাণ’ (এসব কৃপাণের চারটি লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে, একটি কলকাতা মিউজিয়ামে এবং একটি ঢাকা জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে), বৃহত্তর চট্টগ্রামের রাঙামাটির পাহাড়ি এলাকায় ১৯৫৮ সালে মার্কিন নাগরিক ডাইসনের পাওয়া প্রত্ন-প্রস্তর যুগের ‘কুঠার’ (জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত), ফেনীর ছাগলনাইয়া এলাকায় ১৯৬৩ সালে আবিষ্কৃত প্রত্ন-প্রস্তর যুগের পাথরের বিবর্তিত ‘হাত কুঠার’ (জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত), ২০০৮ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে কর্মীভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের গবেষক মো. শাহিনুজ্জামান কর্তৃক চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি, বাঁশবাড়িয়ায় একটি, রাঙামাটির সদর উপজেলার নিউ সার্কিট হাউস এলাকায় তিনটি, কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া বাজারে একটি, লংগদু উপজেলার গুলাশাসালী ইউনিয়নে দুটি ও আদারক ছড়া ইউনিয়নেরদুটি এবং খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার মানিকছড়ি ইউনিয়নে একটি স্থানে ১১টি পাথর ও জীবাশ্ম কাঠের তৈরি নব্য প্রস্তর যুগের কুঠার, সেল্ট, ছেনি, ছাঁছুনি, সেল্ট কাম ছাঁছুনি, পয়েন্টসহ অন্যান্য হাতিয়ার; আদিম মানুষের জীবন-সংস্কৃতির পরিচয়বাহী—এসব নিদর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আদিম মানুষের সঙ্গে চট্টগ্রামের কোনো না কোনো যোগসূত্র ছিল। যদিও তারা এ অঞ্চলের ভূমিজ সন্তান না বহিরাগত, তা গবেষণাসাপেক্ষ ব্যাপার।
চট্টগ্রামের অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়-নদী ও সমুদ্রের সহাবস্থান, সুপ্রাচীনকাল থেকে সমুদ্রোপকূলে অবস্থান, ব্যবসায়িক বিস্তৃতি, শস্যের পর্যাপ্ততা এবং সমুদ্রপথে সম্পদ সংগ্রহ ও আদান-প্রদান সহজতর হওয়ার কারণে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে অনেকটা আগেভাগেই চট্টগ্রামে বসতি গড়ে ওঠে। তবে সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় গড়ে ওঠা প্রথম দিকের সে বসতিগুলো ছিল জনবিচ্ছিন্ন, বিরান ‘গ্রাম’ বিশেষ।
চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দারা প্রাগৈতিহাসিক যুগের গুহামানব ছিল কি না, নাকি অন্য কোনো গোষ্ঠীর—তা আজও নির্ণীত নয়। তবে ধারণা করা হয়, চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দাদের মধ্যে যাদের ধমনিতে অস্ট্রো-এশীয় রক্তধারা এবং দক্ষিণ আরবের গোলমাথার ব্র্যাকিসেফাল (Brachycephals) জনগোষ্ঠীর রক্তের সংমিশ্রণ ঘটেছিল, তারাই মূলত এ অঞ্চলে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। তারা অবশ্য সংখ্যায় ছিল একেবারেই নগণ্য এবং প্রধানত আদি শ্রেণিহীন কমিউন জীবনযাপন করত।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক ও কবি