হাসিনা ভারতে পালাইছে, খবরটা নিশ্চিত হয়া খুশিতে সেজদায় লুটায়া পড়ে আবদুল্লাহ। সেজদায় গিয়া অস্বাভাবিক আওয়াজ তুইলা কাইন্দা ফেলে। ওর তখন এই হুঁশও নাই যে কান্দন দেইখা বাড়ির মানুষজন কী ভাববে। এত বড় ছল, বিয়া করাইলে তিন ছলের বাপ হইতো, উই কিনা হাউমাউ কইরা কান্দে। কিন্তু বাড়ির সবাই জানে, এই কান্নার নিচে লুকায়া আছে কী ভয়ানক আগুনের পাহাড়। কেউ ওরে বিব্রত করে না। কান্দুক, জান ভইরা কান্দুক।
আরও পাঁচ দিন আগেই এই খবরটার জন্য রেডি ছিল। আবদুল্লাহই বলছিল, দেইখো এক সপ্তাহও টিকবে না আর এবং সত্যিই পাঁচ দিনও যাইতে পারল না। খবরটা প্রথম পায় ফেসবুকে। প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে বিভিন্ন উড়া খবর পাইলেও এএফপির সাংবাদিক শফিকুল আলমের একটা স্ট্যাটাস অনেকখানিই বিশ্বাস আইনা দিছিল: Hasina and her sister have left Ganobhaban for a ‘safer place’, a key aide said. কিন্তু তাও অফিশিয়াল ঘোষণা আসা পর্যন্ত ওয়েট করতেছিল আবদুল্লাহ।
এই স্ট্যাটাস শেয়ার করার পাঁচ মিনিট পরেই আবার হঠাৎ কইরা ইন্টারনেট বন্ধ কইরা দিছিল আধা ঘণ্টার জন্য। এই সময় রাজশাহীর বন্ধুরে ফোন দিয়া শোনে, ৩টায় নাকি টিভিতে ভাষণ দিবে সেনাপ্রধান। তার মানে হাসিনা পালাইছে। যখন আবার নেট আইলো, তখন ব্রাউজারে টিভি ওপেন কইরা দেখে যে সেনাপ্রধান ভাষণ এখনো দেয় নাই, এমনকি আরও এক ঘণ্টা পিছায়া ৪টায় দেওয়ার কথা, তাও দিল না; শেষ পর্যন্ত সাড়ে ৪টায় ভাষণ দিল।
সেজদা থেকে উইঠা হাত-মুখ ধুইয়া ওজু কইরা রাস্তায় বের হয় আবদুল্লাহ। টার্গেট মুক্ত বাতাসে মানুষের আনন্দ দেখা আর মিষ্টি কেনা। শেরুয়া বটতলা থেকে শেরপুর যাবে—একটা খালি অটো-রিকশা ভ্যান কিচ্ছু নাই। সব ভরা। উপায় না পায়া হাঁটতে শুরু করে দুই ভাই। ছোট ভাই সোহানের পাশে দাঁড়াইলে আবদুল্লাহরেই ছোট মনে হয়! অচেনা কেউ বলতেই পারবে না যে, কে বড় কে ছোট!
চারপাশে এত মানুষ! গিজগিজ করতেছে। ছ্যাড়া, বুড়া, বউ, ছল—কেউ বাদ নাই, সবাই বাইর হইছে। এমনকি পর্দা করা বউ-ঝিরাও নিজেগোরে আঙিনায়, আঙিনা তো না, চাতালে চাতালে জড়ো হয়া রাস্তার মানুষজন দেখতেছে। সবার মুখ হাসি খুশি। আবদুল্লাহ চারদিক দেখে আর হাসে। মানুষের আনন্দ দেখে পরান ভইরা। আনন্দে চোখ বাইয়া পানি নামে। আজ আর নিজেকে কন্ট্রোল করবে না।
হাঁটতে হাঁটতে কত কথা মনে পড়ে আবদুল্লাহর। বানের পানির নাকলা হুড়মুড় কইরা আসতে থাকে গুমের কথা। শাপলার পরাজয়ের অপমান। বছর বছর ওই দিনটায় নিয়ম কইরা পোস্ট দেয়। ২০২১ সালেও দিছিল। কিন্তু কপালের লেখা খারাপ ছিল। পলিটেকনিকের ছাত্রলীগের দিলীপ সাহারে ব্যাচমেটদের কেউ একজন পোস্টের স্ক্রিনশট সাপ্লাই দিছিল।
অথচ আবদুল্লাহ ভালোই হুঁশিয়ার। কাউরে সহজে লিস্টে নেয় না। ব্যাচমেটদের ভেতর ১৫-২০ জন আছে। পোস্টও দেয় সব ‘অনলি ফ্রেন্ড’ কইরা। তাছাড়া সে নির্লিপ্ত একটা ছেলে। কারু পাকা আবাদে কোনোদিন মই দেওয়া তো দূরে থাক, আরেকজনের খ্যাতের আইলও পাড়ায় না।
সেই আবদুল্লাহর নাম দিলীপ সাহা থেকে কই কই যে গেল, শেষ পর্যন্ত এক বিকালে বাদ আসর জামিল মাদ্রাসার গেইট থেকে একটা সাদা মাইক্রোবাসে চার-পাঁচজন সাদা পোশাকের একদল লোক তুইলা নিয়া গেল।
এরপর দুনিয়ার বুকে জাহান্নাম নাইমা আসার সেই ১৩ দিন। কই ছিল আবদুল্লাহ, কেউ জানে না। থানা পুলিশ, ডিবি, র্যাব কোনো কোনোখানে বাদ থোয় নাই আবদুল্লাহর বাপ-ভাইয়েরা। কিন্তু কোনো লাভ হয় নাই। এমনকি বড় ভাইয়ের চাচাশ্বশুর পুলিশেক কয়াও লাভ হয় নাই। যে থানাতেই যায়, কয় যে তারা এ ব্যাপারে কিছু জানে না। এমনকি জিডি পর্যন্ত নেয় না। পূর্বশত্রুতার জেরে কেউ খুন কইরা থাকতে পারে? ওর ক্লাসমেটরা কেউ বলতে পারে না যে, ওর আসলেই কারু সাথে শত্রুতা থাকতে পারে।
তবে সমস্যা একটাই—আবদুল্লাহ দাড়ি রাখত আর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত। ওর ছাগইলা দাড়ি নিয়া বন্ধুবান্ধবরা যদিও হাসাহাসি করে। কিন্তু আবদুল্লাহ দাড়ি থোওয়ার ফজিলত আর ফেরেশতাদের উপস্থিতি নিয়া খুবই রসালো একটা বয়ান দিত। এক সাহাবির একটাই দাড়ি ছিল। সেই দাড়িতে ৭০টা ফেরেশতা দেখতে পাইছিলেন আল্লার রসুল। আব্বা পরাই পরাই এই গল্প করত।
আব্দু্ল্লাহ হাফেজ, মাওলানা লাইনেও পড়ছে পাঁচ-ছয় বচ্ছর। সুযোগ বুইঝা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে JSC, SSC পরীক্ষাও দিছিল। রেজাল্টও মাশাল্লাহ ভালো। পরে Engineering নিয়া আগ্রহের কারণে বগুড়া পলিটেকনিকে পরীক্ষা দিছিল, চান্সও পাইল। আর কোনো চিন্তা না কইরা সেইখানেই ভর্তি হয়া গেল। জামিল মাদ্রাসার কাছে হওয়াতে টানটা আরও বেশি ছিল। পড়াশোনাও হইল, ধর্ম থেকেও দূরে থাকা লাগল না। পলিটেকনিকের মসজিদে আমানুল্লাহ হুজুর যতদিন নামাজ পড়াইছেন, ততদিন সেইখানেই নামাজ পড়ত। সময় সুযোগ থাকলে জামিল মাদ্রাসাতেও যাইত। কিন্তু আমানুল্লাহ হুজুর ইমামতি ছাইড়া দিলে জামিলে যাতায়াত বাইড়া যায়। ফলে খুব সহজেই আবদুল্লাহ ছাত্রলীগের নজরে পড়ে যায়। শিবির সন্দেহ করে। সন্দেহ পর্যন্তই। কিন্তু জামিল মাদ্রাসার সাথেই বইলা এদের অভিজ্ঞতা কয়, কওমি মাদ্রাসায় যারা পড়ে তারা শিবির করে না। কওমির হুজুররা মওদুদিরে দেখতে পারে না।
তবু সন্দেহ করত। সন্দেহ করতে তো দোষ নাই! সন্দেহ কইরা চাপে রাখা যায়। একজন ছাত্ররে শিবির সন্দেহ করার জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া আর দাড়ি রাখাই যথেষ্ট না? তার উপর সে কোনো দিন বঙ্গবন্ধুরে নিয়া একটা লাইনও লেখে নাই। এমনকি প্রধানমন্ত্রীরেও ধন্যবাদ দেয় নাই কখনো। আর উপর প্রতি বছর শাপলা নিয়া ঘ্যানঘ্যান করে। ও শিবির না তো কে শিবির!
অতএব পটেনশিয়াল শিবির হিসেবে আবদুল্লাহরে ১৩ দিন দুনিয়ায় বানানো জাহান্নামে বাস করতে হয়। বছর খানেক ধইরা শুনতেছে গোপন ওইসব বন্দিশালার নাম নাকি আয়নাঘর।
শেরপুর পৌঁছে দেখে বেশিরভাগ মিষ্টির দোকান বন্ধ। দুই-একটা খোলা থাকলেও সব মিষ্টি শ্যাষ হয়া গেছে।
পোলাপানের স্লোগান কানে আসতেছে, ‘পালাইছে রে পালাইছে, মোদির বউ পালাইছে! মুখে নেওয়া যায় না, নতুন-পুরান এমন সব খারাপ স্লোগানও চলতেছে।
হঠাৎ হঠাৎ ভ্যানে রিকশায় সিএনজিতে কইরা আহত মানুষ নিয়া উপজেলা হাসপাতালে ছুটতেছে কারা জানি। এখনো কি গুলি চালাইতেছে পুলিশ?
নিউ মার্কেটের কাছে যেহেতু আসছেই, কাছেই উপজেলা মসজিদ। আসরের আজান দিছে রাস্তায় থাকতেই। এখনো ওয়াক্ত আছে। নামাজটা তাইলে আর কাজা হবে না। তারা দুইজনেই ওজু কইরা নিজেরা জামাত কইরা নামাজ পড়ে। নামাজ শেষে একটু আরাম লাগে। প্রায় ঘণ্টাখানেক হাঁটছে। কোনোদিনই সেই বটতলা থেকে এতদূর হাঁইটা আসে নাই।
একটু দম নিয়া বটতলার দিকে হাঁটা ধরে আবার। হাঁটতে খারাপ লাগতেছে না। একটা মুদি দোকান খোলা পাওয়ায় দুই ভাই দুইটা কোন আইসক্রিম কেনে। এইটা দিয়াই হউক মিষ্টিমুখ।
দ্রুত বেগে একটা হাইস চইলা যাইতে দেইখা আবদুল্লাহর মনে পইড়া যায়, এইরকমই একটা গাড়ি ২০২২ সালের সেই মে মাসের মাঝামাঝি আবদুল্লাহরে তুইলা নিয়া গেছিল। চার-পাঁচ ঘণ্টা সেই গাড়ি চলার পর একটা অন্ধকার সেলে রাখা হইছিল। ততক্ষণ পর্যন্ত আবদুল্লাহ কোনো কথা বলে নাই। এমনকি চিৎকার দিবে সেই সুযোগই ওরা দেয় নাই। ঘটনার আকস্মিকতায় একদম ঘাবড়ায়া গেছিল।
আরও প্রায় ঘণ্টা দেড়েক পরে, সেল থেকে বাইর কইরা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়া যায়। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদে যেসব প্রশ্ন আর অভিযোগ তোলে, আবদুল্লাহর কাছে তা বিস্ময়কর এবং অবাস্তব মনে হয়। ওর সাথে আর কে কে আছে, আর ওর লিডার কে, এইসব রাষ্ট্রবিরোধী কাজের জন্য টাকা কে দেয়, কোন রাষ্ট্র তাদের পিছনে ইন্ধন জোগাইতেছে কি না—কিছুই বলতে পারে নাই। জানলে তো বলবে!
অকথ্য নির্যাতনের অত্যাধুনিক সব পদ্ধতি প্রয়োগ কইরাও কোনো উত্তর বাইর করতে পারে নাই। কাজেই ১৩ দিনের দিন আবারও গাড়িতে তুইলা চার-পাঁচ ঘণ্টা পর ছাইড়া দেয় নাটোর-রাজশাহী রোডে। ছাইড়া দেওয়ার আগে বহুবারের মতো আবারও হুঁশিয়ার কইরা দেয়—মনে থাকবে তো? শাপলা নিয়া কোনো কথা না!
কোনো রকম মুচলেকা দিয়া বাইর হইছিল। এরপর আর কোনোদিন শাপলা নিয়া কথা কয় নাই। ওই একটা বিষয় নিয়াই সে সবসময় কথা বলত। গুম হওয়ার পর থেকে আর সেইটাও বলে না।
পালস হাসপাতালের কাছে আইসা ডাবল ভাড়ায় একটা ভ্যানে উইঠা পড়ে দুই ভাই। বাড়িত যাইতে যাইতে মাগরিবের ওয়াক্ত চইলা গেছে। কাজা নামাজ আদায় কইরা আরও দুই রাকাত নফল নামাজ পইড়া ল্যাপটপ খুইলা বসে। ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে ভাবে, হাসিনার তো পতন হইছে, দিলীপ সাহাও আর ধরতে পারবে না, পলিটেকনিক থেকে বাইর হওয়ার ৯ মাস হয়া গেছে—এখন তো চাইলে শাপলা নিয়া কথা বলতে পারে। আসলেই পারে?
সাহস হয় না। নির্যাতনের ট্রমা এখনো যায় নাই আবদুল্লাহর—এখনো লাইফবয় সাবান দেখলে ভয় লাগে; এখনো সাদা মাইক্রোবাস দেখলে আত্মা শুকায়া যায়; এখনো অন্ধকার ঘরে ঘুম আসে না, হাসফাস লাগে; দুঃস্বপ্ন তো হরহামেশাই দেখে।
তাছাড়া দুই দিন পর কে ক্ষমতায় আসে, তার নাই ঠিক। তার থেকে চুপ কইরা থাকাই ভালো।
ফেসবুক নিয়াই বইসা থাকে। সমানে নানান রকম ছবি, পোস্ট, ভিডিও আসতেছে। শেখ মুজিবের মাথায় পানি ঢালতেছে কেউ। গণভবনে হাসিনার জন্য রান্ধা খাবার খাইতেছে জনতা। শ্রীলঙ্কার মতোই দৃশ্য। হাসিনার বেডরুমে শুইয়া পড়ার পোজ দিতেছে। কেউ একজন হাঁস নিছে, কেউ ছাগল নিছে, আবার কেউ নিছে ইয়া বড় পাঙাশ। একজনের হাতে বইও দেখল। কয়েকজন আপু নিছে শাড়ি।
সংসদেও জনগণ ঢুইকা পড়ছে। কেউ একজন সিগারেট ধরাইয়া পায়ের উপর পা তুইলা সুখ টান দিতেছে। আবদুল্লাহ সিগারেট খায় না। পছন্দও করে না। কিন্তু এই ছবি দেইখা মনে হইল, মজাই আলাদা।
সে যদি আজ ঢাকায় থাকত! ১৯ জুলাই তারিখে রাস্তায় বাইর হয়া ছাত্রলীগের দাবাড়ও খাইছে। ইন্টারনেট চালু হওয়ার পর, লকডাউন যখন শিথিল করছে, ২৫ তারিখেই গাজীপুরের মেস ছাইড়া বাড়ি চইলা আসছে। ঢাকা ছাড়ার আফসোস হয় আবদুল্লাহর। ইতিহাসের অংশ হইতে পারত! এমন দিন জীবনে কয়বার আসে!
আজ গাজীপুরে থাকলে নিশ্চয়ই ভোরেই রওনা দিত ঢাকার উদ্দেশে। জয়দেবপুর থেকে ঢাকা আর কয় কিলো। আরও কত দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ভাইঙা আসছে! আর তো জয়দেবপুর!
আজ অন্তত মিছিলে গেলে কোনো সাদা মাইক্রোবাসের খাওয়া ছিল না। সাদা পুলিশ কালা পুলিশ কাউরে দোচার টাইম নাই। আবদুল্লাহ কখনো মেজাজ হারায়া ফেললে গালি দেয়। পরে অবশ্য তওবাও করে।
আবদুল্লাহ মনে করে শাপলার প্রতিশোধ আজ নেওয়া হয়ে গেছে। আল্লার কী লীলা, আজকেও ৫ তারিখ!
মাগরিবের আজান ভাইসা আসে। আজানের আওয়াজ কানে আসলেই জামিল মাদ্রাসার আজানের কথাই সবসময় মনে পড়ে। কত স্বপ্ন নিয়া জামিল মাদ্রাসায় ভর্তি হইছিল সে। যদিও কাফিয়ার পরে আর পড়া হয় নাই। কিন্তু ওইটাই আব্দু্ল্লাহর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়।
২০১৩ সালই ছিল জামিল মাদ্রাসায় প্রথম বছর। আন্দোলনের সময় আবদুল্লাহ পড়ে দহমে। সাদেক হুজুরের রুমে থাকে। রেজাল্ট ভালো করায় ছয় মাস পরেই উর্দু থেকে ফার্সি জামাতে ওঠার সুযোগ পাইছিল। ওই সময়েই আমানুল্লাহ হুজুরের সাথেও পরিচয়। উনি তাইসির পড়াইতেন। ফার্সি শব্দের গঠন আর বিশ্লেষণ ওনার কাছ থেকেই শেখা। বাকি জীবন সেইটা অনেক কাজে লাগছে।
এক রাতে আবদুল্লাহ শোনে, একদল নাস্তিক ব্লগার হজরত মুহাম্মদ (সা.)-রে নিয়া অকথ্য ভাষায় গালাগালি করছে। ওইসব শুইনা পইড়া আবদুল্লাহর দুই চোখ বাইয়া পানি পড়তে থাকে। সে ভাবতেই পারে না, একদল মানুষ বিনা উসকানিতে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের প্রিয় নবীরে এইরকম নোংরা ভাষায় কেন গালি দিবে! বাংলাদেশের ইতিহাসে এতটা নোংরামি কেউ করার সাহস পায় নাই। ওরা সরকারের মদতেই ওইসব করতেছিল। আবদুল্লাহদের মাদ্রাসায় নিয়মিত দোয়ায় বদ দোয়ায় নাস্তিক ব্লগারদের জন্য দুনিয়ায় শাস্তি এবং আখেরাতে জাহান্নামের আবেদন করা হইতেছিল।
এসব করে যখন মন আর মানতেছিল না, তখন বাংলাদেশের সবথেকে বড় মাদ্রাসা হাটহাজারী থেকে হেফাজতে ইসলামের আন্ডারে বাংলাদেশে সকল কওমি মাদ্রাসা একত্রিত হইল। তাদের মাধ্যমে আল্টিমেটাম দেওয়া হইল। সারা দেশে সভা-সমাবেশ করা হইল।
৬ এপ্রিল জামিল মাদ্রাসা থেইকা মিছিল নিয়া ঢাকার দিকে লংমার্চ করার কথা ছিল। কিন্তু মিছিল বনানী মোড়ে গিয়া পুলিশের বাধায় ওইখানেই সমাবেশ শুরু হয়। সারা দিন নফল রোজা ছিল আবদুল্লাহ। মাদ্রাসা থেকেই রোজার ব্যবস্থা করা হইছিল। সেই কী রোদ, আল্লা! রোদের ঠেলায় রাস্তার পিচ যেন গইলা গইলা যাইতেছিল। সারা দিন রোদের ভেতর বইসা থাকতে থাকতে নাকের চামড়া পুইড়া গেছিল আবদুল্লাহর। স্পষ্ট মনে আছে।
৩০ এপ্রিল জামিল মাদ্রাসার উদ্যোগে বগুড়া সেন্ট্রাল ঈদগাহ মাঠে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশের দিন আহমদ শফী হুজুর হেলিকপ্টারে করে যখন বনানী সুলতানগঞ্জ হাইস্কুল মাঠে নামে, আবদুল্লাহ তখন ভিড় ঠেইলা কাছে যাইতে পারে নাই। ওইখান থেকেই পরে সেন্ট্রাল ঈদগাহ মাঠে গেছিল হাঁটতে হাঁটতে! গিয়া দেখে, মানুষের মেলা!
ঈদগাহ মাঠ থেকে একটু দূরে সেউজগাড়ি সরকারি প্রাইমারি স্কুলের পাশেই আবদুল্লাহর বড় ভাই থাকত। সমাবেশে একটু থাইকা ওর ভাইয়ের ল্যাপটপের লোভে মেসে চইলা যায়। পরে সারাদিন ওইখানেই ছিল। অল্প অল্প হিন্দি বুঝত তখন। তামিলের কী একটা ডাবিং করা, আর সালমান খানের তেরে নাম মুভি দেখছিল, মনে পড়ে।
৫ মে ঢাকা অবরোধের প্রস্তুতি হিসাবে জামিল মাদ্রাসা ছুটি দিয়া দিলে বাড়ি চইলা গেছিল আবদুল্লাহ। ইচ্ছা ছিল ৪ মে ঢাকা যাবে। আবদুল্লাহর মামারা সব আওয়ামী লীগ। নানীগোরে বাড়ি গেলে মামা আর মামাতো ভাইয়েরা ছাইক্কা ধরে আবদুল্লাহরে। তেঁতুল হুজুর বইলা আহমদ শফী হুজুররে খেপায়। আবার এত ছোট বাচ্চাদের নিজেদের ক্ষমতা লাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কথা বলে। হেফাজতিদের ১৩ দফা মানলে এই দেশ মধ্যযুগে চইলা যাবে, আফগানিস্তান হয়া যাবে—কত কথা। আবদুল্লাহ দাঁতে দাঁত চাইপা হজম করে। দুই-একটা কথার জবাব দিতে গিয়াও ওদের সম্মিলিত আক্রমণে টিকতে পারে নাই।
৩ মে বগুড়া আসবে আবদুল্লাহ। সবাই মিইলা একসাথে যাবে। সেই উদ্দেশ্যে ব্যাগ গোছায়া আব্বার কাছে টাকা চায় আবদুল্লাহ। মা যাইতে দিবে না। কিন্তু আবদুল্লাহ তো যাবেই। ওর মাও ব্যাগ লুকায়া রাখে। টাকা দিবে না, সাফ হারাম। পরে চাচাতো ভাইয়ের কাছ থেকে ১০০ টাকা ধার করে। কিন্তু মা আর ব্যাগ দেয় না। পরে আব্বাও যাইতে মানা করে। ফলে বাপ-মায়ের হুকুম অমান্য কইরা আর যাওয়াই হয় নাই।
পরদিন ৫ মে শাপলা চত্বরে নাইমা আসা কারবালা আবদুল্লাহর জীবনে দীর্ঘ অপমান আর বেদনার যে সূচনা করে তা আজও শেষ হয় নাই। কত অপমান সইতে হইছে আত্মীয় স্বজনদের কাছে। গুম, নির্যাতন এবং মাইরা ফেলার হুমকি পর্যন্ত পাইতে হইছে।
ফেসবুক বন্ধ রাইখা হঠাৎ কইরা বড় ভাবির কাছে খোঁজ নেয়, রাইতের রান্ধন-বাড়নের ব্যাপারে। শোনে, কচুর লতা শুঁটকি দিয়া চচ্চড়ি আর ডাইল। আবদুল্লাহর কাছে কিছু টাকা ছিল। বড় ভাবিরে বলে, একটু দাঁড়ান, গোশতো তো পামুই না, মুরগিই আনি বটতলা গিয়া।
পাঞ্জাবি গায়ে দিয়া বাইর হবে, দরজা খুইলা বাইরে এক পা দিয়া থাইমা যায় আবদুল্লাহ। অনেক অন্ধকার। বুকের ভেতরে কী একটা নইড়া ওঠে। রাস্তার আলো নিভা, ঝিঁঝি পোকা ডাকতেছে, পাড়া ফাঁকা—এই রকম অন্ধকার ওই ১৩ দিনের পরে আর সহ্য হয় না আবদুল্লাহর। জানে যে, এইটা বাড়ির সামনের রাস্তা। জানে যে, এই অন্ধকারে কোনো সাদা মাইক্রোবাস নাই। তবুও পাও সরে না।
মনের কোনো এক গহিন কোণে সুতাছেঁড়া গুড্ডির মতন একটা কথা ঘুরতে থাকে—হাসিনা পালাইছে, দিলীপ সাহা পালাইছে, কিন্তু ভয়টা এখনো পালায় নাই।
ছোট ভাইরে ডাক দেয়, চল্ তো বাজারে যাই।
সোহান আবদুল্লাহর খুব ন্যাওটা। ভাই তো না, বন্ধু। সোহান আসতেই দুইজন একসাথে বাইর হয়। আবদুল্লাহ লক্ষ করে, আজ রাইতে আকাশে অনেক তারা। অন্ধকার পায়ে মাড়ায়া দুই ভাই রাস্তা ভাঙতে থাকে।