তানভীর ছিল আমার বন্ধু।
শাপলার বছর শাহবাগের জলসার মতো আমাদের অনাদর্শিক বন্ধুত্ব কিছুদিন জেগে ছিল।
আমরা শাহবাগের উপর দিয়ে বাংলামোটরে যেতাম
তারপর কারওয়ান বাজারের উচ্চতম অট্টালিকা মুখরিত হতো আমাদের তারুণ্যে।
কিন্তু সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলে, সেখানে আমার গা ছমছম করত
অন্ধকারের ভয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমরা শাহবাগ পার হয়ে পল্টন মোড়ে এসে দাঁড়াতাম
পল্টনে অনেক আলো
আলোর বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বায়তুল মোকাররম, দৈনিক বাংলা, শাপলা চত্বর, তারপর নিজস্ব শহরের রাস্তা
একদিন আচমকা আমাদের রাস্তা আলাদা হয়ে গেল
সন্ধ্যার পর অন্ধকার শাহবাগ অতিক্রম করে তানভীর আসতে পারল না
জাগরণের জাহিলিয়াত বিষাক্ত সাপের মতো তানভীরের মস্তিষ্কে ঢুকে গেলে
কাল নীল হয়ে গেল তানভীরের রুহ
মতিঝিলের কাছাকাছি থেকে আমি ‘তানভীর, তানভীর’ বলে ডাকতে লাগলাম
আর ঠিক তখন সমগ্র বাংলাদেশ এক অলৌকিক ভূমিকম্পে দুই খণ্ডে বিভক্ত হয়ে গেল
বাড়ন্ত ফাটল অতিক্রম করে দলে দলে মানুষ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের দিকে আসতে থাকল
তাদের স্বাগত জানাল বায়তুল মোকাররমের মিনার, তার বিচ্ছুরিত আলো
আমি পা উঁচু করে ভিড়ের মধ্যে তানভীরকে খুঁজতে লাগলাম
তানভীর শাহবাগের অন্ধকারে আটকে থাকল
বাংলাদেশে আসতে পারল না
শাপলার বছর আমাদের বন্ধুত্ব ভেঙে গেল
পতিত পুরোনো প্রদেশে তানভির এখন কী করে? খুব জানতে ইচ্ছে হয়।
কিন্তু নতুন করে জানবার আর কী-ই বা আছে?
পৃথিবীর প্রতিটি পতিত প্রদেশই এখন পুরোনো গোরস্থান
দুপুরের বাসন্তী বাতাসের মতো তানভীরের নামে এখনো হৃদয়ে জমা হয়
হু-হু শূন্যতার হাহাকার
তানভীর মির্জা, আমার শাপলা বছরের বন্ধু,
আমার বুকের কবরে তার লাশের নড়ন আমাকে কাঁদায়
আমরা কবরবাসীদের জন্য যেভাবে আমাদের হাত সর্বদাই আকাশে উত্তোলিত রাখি
সেভাবে তানভীরের জন্য আমার হাত আরশের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে
বাংলাদেশের দিগন্তে দাঁড়িয়ে আমরণ অপেক্ষা করবো
তানভীর, আমার বন্ধু, ফিরে আসবে।