হোম > সাহিত্য সাময়িকী > গল্প

জীবনের বৃত্তের বাইরে

আব্দুস সালাম

ঢাকা শহরে সন্ধ্যা নামে বড় নিঃশব্দে। হাজার হাজার বাতি জ্বলে ওঠে, রাস্তায় গাড়ির আলো ছোটে, মানুষের ভিড় বাড়ে—তবু কোনো কোনো ঘরে সন্ধ্যা মানেই অন্ধকার। ফাহাদ সাহেবের কাছে সন্ধ্যাটা ঠিক তেমন।

সাততলার ফ্ল্যাটটির বারান্দায় একটি পুরোনো বেতের চেয়ার আছে। প্রতিদিন বিকেলে তিনি সেখানে এসে বসেন। একসময় এই বারান্দায় বসেই স্ত্রী জাইমার সঙ্গে চা খেতেন। দুই মেয়ে দরিমা আর দায়মা তখন ঘরময় হইচই করত। আজ সেই একই ঘর, একই বারান্দা, একই আকাশ—শুধু মানুষগুলো নেই।

ফাহাদ সাহেব সরকারি চাকরি করেছেন সারা জীবন। ছোট পদ দিয়ে শুরু করে একসময় বড় পদেও বসেছেন। অর্থের অভাব ছিল না। শহরে নিজের ফ্ল্যাট করেছেন, গ্রামে জমিজমাও আছে। দুই মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করেছেন। দরিমা আর দায়মা দুজনেই মেধাবী। বৃত্তি নিয়ে আমেরিকায় পড়তে গিয়ে সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বিয়ে করেছে, সংসার পেতেছে।

ফাহাদ সাহেব তখন গর্ব করে পরিচিতদের বলতেন, আমার মেয়েরা নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। বাবার আর কী চাই!

তখন তিনি জানতেন না, মানুষের সব চাওয়া যৌবনে বোঝা যায় না।

অবসরের কিছুদিন পরেই জাইমা অসুস্থ হলেন। রোগটা প্রথমে সামান্য মনে হলেও শেষ পর্যন্ত আর সামান্য থাকল না। একদিন হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে স্বামীর হাত ধরে তিনি শুধু বলেছিলেন, তুমি একা থাকতে পারবে তো?

ফাহাদ সাহেব হেসেছিলেন—কী যে বল! মেয়েরা আছে, আত্মীয়স্বজন আছে। আমি আবার একা কোথায়?

জাইমা আর উত্তর দেননি। সেই প্রশ্নের উত্তর ফাহাদ সাহেব আজও দিয়ে চলেছেন।

মেয়েরা মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে এসেছিল। কেঁদেছিল, বাবাকে জড়িয়ে ধরেছিল। কয়েক সপ্তাহ পর আবার ফিরে গিয়েছিল নিজেদের জীবনে। বাবাকে সঙ্গে নিতে চেয়েছে বহুবার। কিন্তু ফাহাদ সাহেব যাননি। তিনি বলেন, ওদেশে গিয়ে কী করব? তোমরা সকালে বেরিয়ে যাবে, ফিরবে রাতে। এখানে অন্তত নিজের ভাষায় মানুষের কথা শুনি।

শেষ পর্যন্ত মেয়েরাও আর বেশি জোর করেনি।

এক বিকেলে পুরোনো বন্ধু রোহান সাহেব এলেন। দুজনে বারান্দায় বসেছিলেন। নিচে তখন মানুষ অফিস থেকে ফিরছে। ফাহাদ সাহেব অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, রোহান, জানিস, এখন আমি দিনের আলোকে ভালোবাসি।

রোহান হাসলেন, আগে কি অন্ধকার ভালোবাসতি?

না রে। আগে অন্ধকারকে ভয় পাওয়ার কারণ ছিল না। ঘরে ফিরলেই জাইমাকে দেখতাম। মেয়েদের কথা শুনতাম। এখন সন্ধ্যা নামলেই মনে হয় পৃথিবীর সবাই আমাকে ফেলে কোথায় যেন চলে গেল।

রোহান বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ফাহাদ সাহেব বললেন, রাতে ঘুম হয় না। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করি। মনে হয়, সকালটা কখন হবে! সকাল হলে জানালা দিয়ে মানুষ দেখি, রিকশা দেখি, ফেরিওয়ালার ডাক শুনি। বুঝতে পারি পৃথিবীতে মানুষ আছে। রাত হলেই শুধু মনে হয়—আমি একা।

একটু থেমে তিনি মৃদু হাসলেন। সারা জীবন কত টাকা রোজগার করলাম। কত লোক আমার ঘরের সামনে বসে থাকত। কত আত্মীয় কাজ নিয়ে আসত! তখন বিরক্ত হতাম। কারো সঙ্গে হয়তো ভালো ব্যবহারও করিনি। আজ তাদের কাউকে কাছে পেতে ইচ্ছে করে। কী আশ্চর্য, না?

রোহান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, আমাদের জীবনটাই বোধহয় এমন, দোস্ত। আমার ছেলেরাও তো বিদেশে। কাল তোর জায়গায় আমিও বসতে পারি।

ফাহাদ সাহেব নিচু গলায় বললেন, আমরা সন্তানকে বড় করি যেন তারা উড়তে পারে। তারা উড়ে গেলে আবার আকাশের দিকেই তাকিয়ে থাকি—কখন ফিরবে!

কথাটা শুনে রোহান আর কিছু বলতে পারলেন না।

ঘরের কাজের জন্য একটি ছেলে আছে। বাজার করে, ওষুধ এনে দেয়, রান্নাবান্নায় সাহায্য করে। অথচ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফাহাদ সাহেবের মনে ভয়ও বেড়েছে।

ছেলেটাকে ছাড়া চলতে পারি না, আবার তাকেই কখনো কখনো ভয় পাই। ভাবি, যদি কোনো রাতে আমাকে মেরে সবকিছু নিয়ে পালায়! দেখ, মানুষের কী দশা—যাকে দরকার, তাকেই বিশ্বাস করতে পারি না।

তারপর হঠাৎ বন্ধুর হাত ধরে বললেন, রোহান, আমাকে একটা বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে আসবি?

রোহান চমকে উঠলেন, তুই বৃদ্ধাশ্রমে যাবি?

হ্যাঁ। সেখানে অন্তত দুটো মানুষ থাকবে। কথা বলার লোক থাকবে। আমার এখন ভাতের অভাব নেই, কাপড়ের অভাব নেই, টাকারও অভাব নেই। অভাব শুধু একজন মানুষের—যে পাশে বসে বলবে, আজ শরীরটা কেমন?

রোহান মুখ ফিরিয়ে নিলেন। বন্ধুর সামনে চোখের জল দেখাতে তার লজ্জা করছিল।

ফাহাদ সাহেব আবার বললেন, আর একটা কথা রাখিস। কোনোদিন যদি শুনিস, আমি হঠাৎ চলে গেছি, আমার দাফনের সময় একটু থাকিস। মেয়েরা হয়তো খবর পেয়ে আসতে আসতে দেরি করবে।

চুপ কর, এসব কথা বলিস না।

ফাহাদ সাহেব শান্তভাবে হাসলেন।

মৃত্যুকে এখন আর ভয় পাই না রে। কখনো কখনো মনে হয়, ওপারে জাইমা যদি সত্যিই অপেক্ষা করে থাকে, তবে মৃত্যুও হয়তো একরকম বাড়ি ফেরা।

ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমেছে।

রোহান চলে যাওয়ার সময় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ফিরে তাকালেন। বিশাল ফ্ল্যাটের মাঝখানে ফাহাদ সাহেবকে অদ্ভুত ছোট দেখাচ্ছিল। এত আসবাব, এত স্মৃতি, এত অর্জনের মধ্যে একজন বৃদ্ধ মানুষ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছেন; অথচ তার নিজের বলতে কাছে কেউ নেই।

দরজা বন্ধ করে ফাহাদ সাহেব আবার বারান্দায় এলেন। শহরে তখন হাজার বাতি জ্বলছে। দূরের কোনো ফ্ল্যাট থেকে শিশুর হাসির শব্দ ভেসে এলো। তিনি কান পেতে শুনলেন। মনে হলো, বহু বছর আগের দরিমা আর দায়মা বুঝি পাশের ঘরেই হাসছে। আর রান্নাঘর থেকে জাইমা ডাকছেন—চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।

ফাহাদ সাহেব চোখ বন্ধ করলেন।

তারপর খুব আস্তে বললেন, জাইমা, আর কতদিন?

কেউ উত্তর দিল না। শুধু রাত বাড়তে লাগল। বৃদ্ধ মানুষটি বারান্দায় বসে রইলেন। তার সামনে আলোয় ভরা একটি শহর, পেছনে অন্ধকার ঘর। অথচ তিনি জানেন—কাল আবার সূর্য উঠবে। নিচের রাস্তায় মানুষ নামবে। ফেরিওয়ালা ডাকবে। স্কুলের শিশুরা ছুটবে।

সেই আশাতেই তিনি রাত জেগে থাকেন। এখন তার জীবনে সুখের অর্থ খুব ছোট—আরেকটি সকাল দেখা, আরেকটি মানুষের মুখ দেখা, আর কারো পাশে বসে দুটো কথা বলা।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ফাহাদ সাহেব বুঝেছেন—মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়, বাড়ি নয়, পদমর্যাদাও নয়। হঠাৎ তার মনে হলো, মানুষ আসলে সারা জীবন একটি বৃত্তের মধ্যেই ঘুরতে থাকে। শৈশবের পর লেখাপড়া, তারপর চাকরি, পদোন্নতি, অর্থ, সংসার, সন্তান, তাদের মানুষ করা, প্রতিষ্ঠিত করা—একটি বৃত্তের পর আরেকটি বৃত্ত। ফাহাদ সাহেবও সেই নিয়মেই জীবন কাটিয়েছেন। একদিন যে পদমর্যাদা তাকে আনন্দ দিয়েছে, আজ তার কোনো মূল্য নেই। যে ফ্ল্যাটটি করতে পেরে একসময় বুক ভরে উঠেছিল, আজ সেই ফ্ল্যাটের নিঃশব্দ কক্ষগুলোই যেন তাকে গিলে খেতে আসে। যে সন্তানদের প্রতিষ্ঠাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন, তারাও আজ নিজেদের বৃত্তে ব্যস্ত। কেউ দোষী নয়। দরিমা নয়, দায়মা নয়, এমনকি সময়ও নয়। শুধু একেক বয়সে মানুষের বৃত্ত একেক রকম হয়ে যায়।

ফাহাদ সাহেব ধীরে ধীরে বুঝতে পারলেন, তার পুরোনো বৃত্তটি ভেঙে গেছে। জাইমা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংসারের সেই চেনা কেন্দ্রটিও আর নেই। অথচ এতদিন তিনি ভাঙা বৃত্তের মধ্যেই সুখ খুঁজে ফিরছিলেন। কেন? বৃত্তের বাইরেও তো মানুষ আছে। হয়তো কোনো বৃদ্ধাশ্রমের ছোট্ট বারান্দায় তারই মতো কয়েকজন মানুষ বিকেলে বসে চা খাচ্ছেন। কেউ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, কেউ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ ব্যবসায়ী—আবার কেউ হয়তো সারা জীবন খুব সাধারণ একজন মানুষ ছিলেন। সেখানে পরিচয়ের চেয়ে গল্পের মূল্য বেশি। পদমর্যাদার চেয়ে পাশে বসার মানুষটির মূল্য বেশি। ফাহাদ সাহেবের মুখে বহুদিন পর সামান্য হাসি ফুটল।

কাল রোহান এলে তিনি বলবেন, দোস্ত, বৃদ্ধাশ্রমটার খোঁজ নিস। একদিন আমাকে নিয়ে চল। এতদিন নিজের বৃত্তের মধ্যেই সুখ খুঁজেছি। এবার একটু বৃত্তের বাইরে গিয়ে দেখি।

রাত তখন আরো গভীর হয়েছে। অথচ আশ্চর্য, সেদিন তার আর রাতটাকে ততটা ভয়ংকর মনে হলো না। কারণ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি একটি সহজ সত্য বুঝতে পেরেছেন—মানুষ সারা জীবন নিজের চারপাশে কত বৃত্তই না আঁকে—চাকরির বৃত্ত, অর্থের বৃত্ত, সংসারের বৃত্ত, সন্তান আর সামাজিক প্রতিষ্ঠার বৃত্ত। একসময় সেই বৃত্তকেই সে সমগ্র পৃথিবী বলে মনে করে। কিন্তু সময় যখন একে একে বৃত্তের মানুষগুলোকে দূরে সরিয়ে দেয়, তখনই মানুষ আবিষ্কার করে—পৃথিবীটা তার আঁকা বৃত্তের চেয়েও অনেক বড়।

আর হয়তো জীবনের পরন্ত বেলায় সুখ মানে পুরোনো বৃত্তটিকে আঁকড়ে ধরে থাকা নয়; সাহস করে বৃত্তের বাইরে পা বাড়িয়ে আবার একজন মানুষকে খুঁজে নেওয়া।

আরো একটি রাষ্ট্রীয় খুন

জুলাই গীতিকা

দুই টুকরা চাঁদ

বনলতা লেন

পুরোনো শকুন

হয়তো মা

জুলাইয়ের এক দুপুরে

রক্তঋণ

বুকের ভেতর বারুদ পুষে

জুলাইয়ের গল্প