বিশ্ববাণিজ্যের ইতিহাসে কিছু জলপথ আছে, যেগুলোর আয়তন ছোট হলেও গুরুত্ব মহাদেশের চেয়েও বড়। হরমুজ প্রণালি এবং বাব আল-মান্দেব তেমনই দুটি সামুদ্রিক ‘চোকপয়েন্ট’। একটি পারস্য উপসাগরের তেল-গ্যাসের প্রধান দরজা, অন্যটি লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের মাধ্যমে এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ।
ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে নিয়ে জিবুতি ও ইয়েমেনকে যুক্ত করেছে। বাব আল-মান্দেব ফারসি শব্দ। এর অর্থ মৃত্যু দরজা। অতীতে নাবিকরা দিকনির্দেশনা ভুল করে এই পথে দিশাহারা হয়ে পড়তেন বলেই এমন নামকরণ করা হয়েছিল। ভৌগোলিকভাবে এটি সরু; কিন্তু বিশ্ব জ্বালানি অর্থনীতিতে এর গুরুত্ব অসীম।
একটির অচলাবস্থা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে কাঁপিয়ে দেয়; অন্যটির সংকট জাহাজকে আফ্রিকা ঘুরিয়ে দেয়। কিন্তু দুটিই যদি একই সময়ে কার্যত বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সংকট আর মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়বে বিশ্ববাণিজ্য, জ্বালানি, খাদ্য, শিল্প, মূল্যস্ফীতি ও কোটি কোটি মানুষের জীবনে।
২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্য সংকট সেই আশঙ্কাকে আর শুধু কল্পনায় থাকতে দিচ্ছে না। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের হিসাবে ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২০ দশমিক ৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত তরল পরিবাহিত হয়েছে, যা বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম তরল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। একই সময়ে প্রতিদিন ১১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এ পথ দিয়ে গেছে, যা বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের ২০ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ হরমুজ কেবল একটি জলপথ এবং বিশ্ব জ্বালানি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ধমনি।
আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হরমুজ দিয়ে যাওয়া অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেটের প্রায় ৮৯ শতাংশের গন্তব্য এশিয়া। চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া ছিল প্রধান ক্রেতা। তাই হরমুজের সংকটের প্রথম ধাক্কা পড়বে এশিয়ার শিল্পোন্নত অর্থনীতিতে; কিন্তু দ্বিতীয় ধাক্কা পড়বে পুরো বিশ্বে। কারণ তেলের বাজার বৈশ্বিক বাজার।
ইতোমধ্যেই এর নমুনা দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি যুদ্ধ-পূর্ব মাত্রার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে এবং ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
তেলের দাম বাড়লে শুধু পেট্রল-ডিজেলের দাম বাড়ে না। বাড়ে ট্রাকের ভাড়া, জাহাজের ভাড়া, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়, কারখানার উৎপাদন খরচ, কৃষির সেচ ও পরিবহন ব্যয়। অর্থাৎ তেলের দাম হলো অর্থনীতির এমন একটি সুইচ, যেটি চাপ দিলে একসঙ্গে বহু খাতের ব্যয় বেড়ে যায়।
অন্যদিকে বাব আল-মান্দেব বিশ্ববাণিজ্যের আরেক দরজা স্বরূপ। হরমুজের সংকট মূলত জ্বালানি সরবরাহের সংকট। বাব আল-মান্দেবের সংকটের চরিত্র কিছুটা ভিন্ন। এটি বিশ্ববাণিজ্যের সময় ও দূরত্বের সংকট।
ইয়েমেন ও আফ্রিকার জিবুতি-ইরিত্রিয়ার মাঝখানে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর উত্তরে রয়েছে সুয়েজ খাল। ফলে এশিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়া জাহাজের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার।
বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট সেই আশঙ্কাকেই বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথিদের তৎপরতায় বাব আল-মান্দেবও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে নতুন করে উত্তেজনায় বড় বড় জাহাজ কোম্পানি আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ বেছে নিচ্ছে। সম্প্রতি ব্রেন্ট তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
দুটির সংকট একসঙ্গে হলে এখানেই শুরু হবে আসল দুঃস্বপ্ন। হরমুজ বন্ধ হলে উপসাগরীয় তেল ও এলএনজির প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। বাব আল-মান্দেব বন্ধ হলে এশিয়া-ইউরোপের সমুদ্রপথে সুয়েজের কার্যকারিতা আরো কমে যাবে। অর্থাৎ একটি পথ বন্ধ করবে জ্বালানির সরবরাহ, আর অন্যটি বাড়াবে বাণিজ্যের দূরত্ব ও পরিবহন ব্যয়। একসঙ্গে ঘটলে বিশ্ব অর্থনীতি দুই দিক থেকে চাপে পড়বে। বিশ্বের ৮০ শতাংশের বেশি বাণিজ্য সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়।
বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব বোঝার জন্য সুয়েজ খালের কথা মনে রাখতে হবে। এশিয়া থেকে ইউরোপে জাহাজ যদি বাব আল-মান্দেব দিয়ে লোহিত সাগরে ঢুকতে না পারে, তাহলে সুয়েজ খাল ব্যবহার করেও লাভ নেই। তাকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরতে হবে।
এ কারণেই লোহিত সাগরের সংকট শুরু হওয়ার পর বড় বড় শিপিং কোম্পানি আফ্রিকা ঘুরে যেতে শুরু করেছিল। এখন যদি একই সময়ে হরমুজও অচল থাকে, তাহলে জ্বালানি পরিবহন ও কনটেইনার বাণিজ্য দুই ক্ষেত্রেই বিকল্প পথের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে।
২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বাব আল-মান্দেব দিয়ে তেল পরিবহন ৮ দশমিক ১ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন পর্যন্ত উঠেছিল বলে ইআইএর তথ্য দেখায়। একই সময়ে সুয়েজ খাল ও সুমেড (SUMED) পাইপলাইন দিয়ে তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত তরল পরিবহনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ দশমিক ৮ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন। এই সংখ্যাগুলো দেখায়, এই জলপথগুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশের জন্য এ সংকটের অভিঘাত আরো তীব্র হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এটা নতুন বিপদের ঘণ্টা।
হরমুজে তেল ও এলএনজি সরবরাহ কমলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়বে। বাব আল-মান্দেব ও সুয়েজের সংকটে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় বাড়বে। এই দুই ব্যয় একসঙ্গে বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ও বাড়বে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি।
একজন বাংলাদেশি নাগরিক হরমুজ বা বাব আল-মান্দেবের মানচিত্র হয়তো কখনো দেখেননি। কিন্তু ওই দুই জলপথের সংকট তার বাজারের ব্যাগে, বাসের ভাড়ায় কিংবা বিদ্যুতের বিলে এসে পৌঁছাতে পারে।
কৃষির জন্য ডিজেল দরকার। সেচে বিদ্যুৎ দরকার। সার আমদানি করতে বৈদেশিক মুদ্রা দরকার। কৃষিপণ্য পরিবহনে জ্বালানি দরকার। বন্দরে পণ্য খালাস ও দেশের অভ্যন্তরে পরিবহনে জ্বালানি দরকার।
আধুনিক বিশ্ববাণিজ্য দীর্ঘদিন ধরে ‘জাস্ট ইন টাইম’ মডেলের ওপর দাঁড়িয়েছে। কারখানায় কাঁচামাল বেশি দিন পড়ে থাকবে না; প্রয়োজন অনুযায়ী আসবে। কিন্তু সমুদ্রপথে অনিশ্চয়তা বাড়লে এই মডেল ভেঙে পড়ে। একটি কনটেইনার যদি নির্ধারিত সময়ের বদলে দুই-তিন সপ্তাহ দেরিতে আসে, তাহলে পুরো উৎপাদন পরিকল্পনা বদলে যেতে পারে।
এ কারণেই হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবকে আলাদা দুটি আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো বিশ্ব অর্থনীতির দুটি স্পর্শকাতর স্নায়ু। আজ হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় তলানিতে এবং বাব আল-মান্দেবেও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একটি বন্ধ থাকাই যদি বিশ্ববাণিজ্যের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়, তাহলে দুটি একসঙ্গে বন্ধ হওয়া হবে সেই দুঃস্বপ্নের দ্বিতীয় অধ্যায়।
একটি জাহাজকে কয়েক হাজার অতিরিক্ত নটিক্যাল মাইল যেতে হয়। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ে, জাহাজের সময় বাড়ে, ক্রু ও বীমা ব্যয় বাড়ে এবং একই পরিমাণ পণ্য পরিবহনের জন্য বেশি খরচ হয়।
কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শুধু জাহাজ ও বন্দরের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বীমা, ব্যাংকিং, ক্রেডিট, জ্বালানি, কনটেইনার, বন্দর, সরবরাহচুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইন।
হরমুজ এবং বাব আল-মান্দেব, দুটি প্রণালি ভৌগোলিকভাবে অনেক দূরে। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির শিরা-উপশিরায় তারা একই স্রোতের অংশ। একটি তেল ও গ্যাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে; অন্যটি এশিয়া-ইউরোপের বাণিজ্যপথকে সুয়েজের সঙ্গে যুক্ত করে। তাই একটির সংকট অন্যটির বিকল্প নয়; বরং দুটির সম্মিলিত সংকট বিশ্ব অর্থনীতির সরবরাহ, জ্বালানি ও পরিবহন—তিন স্তম্ভেই আঘাত করতে পারে।
সৌদি আরব কিছু তেল হরমুজ এড়িয়ে বিকল্প রুটে পাঠাতে পারে। মিসরের সুমেড পাইপলাইনও গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। কিন্তু এগুলোর সক্ষমতা সীমিত এবং দীর্ঘ সমুদ্রপথের তুলনায় ব্যয় বেশি। EIA-ও উল্লেখ করেছে, বিকল্প রুটগুলো দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও সীমিত সক্ষমতার। অর্থাৎ সংকটের সময় বিশ্ব বুঝতে পারে দক্ষতার জন্য তৈরি বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা সবসময় স্থিতিস্থাপকতার জন্য তৈরি নয়। কারণ হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব যদি একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায়, তখন বিশ্ববাজারে শুধু জাহাজের পথ বন্ধ হবে না, একইসঙ্গে বিশ্বায়নের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসই সংকুচিত হয়ে আসবে।
লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন
fakrul@ru.ac.bd