বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভাজন ও সংঘাত একটি নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিংবা বলা যায়, এটি এ দেশের মানুষের বিধিলিপি অংশ, যার থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় নেই। এ যেন জন্ম-জন্মান্তর ধরে দুঃস্বপ্নের কাল অতিক্রম করা। জুলাইয়ের রক্তাক্ত বিপ্লবের তোড়ে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর অনেকের মধ্যে এই বদ্ধমূল ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, নির্বাচনের পর সব ঠিক হয়ে যাবে এবং আমরা একটি শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক সমাজ লাভ করব। কিন্তু ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যকার কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনা এবং নতুন করে জঙ্গি নাটক অবতরণের আশঙ্কা দেশবাসীকে কিছুটা চিন্তায় ফেলে দিয়েছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যকার সংঘর্ষের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি মুখ্য আলোচনার বস্তুতে পরিণত হয়েছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী সম্প্রতি কয়েক দিনের ব্যবধানে চট্টগ্রাম সিটি কলেজ, ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ, কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠন দুটির নেতাকর্মীদের মধ্যে রক্তাক্ত সংঘর্ষে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজনের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এরই প্রেক্ষাপটে অনেকের মধ্যে এই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, আমরা কি আবার ৯০ দশকের মতো ক্যাম্পাস সংঘাতের দিকে ফিরে যাচ্ছি?
কারণ ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পায়। সবারই হয়তো মনে আছে, আশির দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই দিনগুলোর কথা। তখন সংঘাত-সংঘর্ষের কারণে অনেকবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। হতাহতের ঘটনা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। সেশনজট সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সেই পরিস্থিতিকে তখন লেবাননের সঙ্গে তুলনা করা হতো। কারণ ওই একই সময়ে গৃহযুদ্ধ চলছিল লেবাননে এবং প্রতিদিন হতাহতের ঘটনা ঘটছিল। এখানে উল্লেখ করতে হয়, লেবাননের সেই গৃহযুদ্ধ ১৯৭৫ সালে শুরু হয়ে শেষ হয়েছিল ১৯৯০ সালে। নিহত হয়েছিল দেড় থেকে দুই লাখ আদম সন্তান। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘাতময় পরিস্থিতি সূচনা হয় মূলত ১৯৮০ সালের পর থেকে এবং ৯০-এর দশকের শুরুর দিকেও অব্যাহত ছিল। তখন আমেরিকার বিখ্যাত পত্রিকা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসকে বিশ্বের সবচেয়ে সংঘাতপূর্ণ ক্যাম্পাস হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
এদিকে জুলাই বিপ্লব-উত্তর পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের মন-মানসিকতা যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার পক্ষে, তখন ওই ধরনের সংঘর্ষ অনাকাঙ্ক্ষিত তো বটেই, বরং একদমে কাম্য নয়। নিশ্চয়ই ক্ষমতাসীন দলও চায় না আবার কম্পাসগুলো সংঘাতময় হয়ে উঠুক। অন্যদিকে এ দেশে আবার জঙ্গি নাটক মঞ্চস্থ হোক, সেটিও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে একদমই কাম্য নয়। যদিও এটি নিয়ে খোদ ক্ষমতাসীন দলের মধ্যেই দ্বিমত পরিলক্ষিত হচ্ছে। একদল মনে করে বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নেই। আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য জঙ্গি নাটক সাজিয়ে বহু নিষ্পাপ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। অন্য কেউ কেউ মনে করে জঙ্গির হুমকি কমেছে, অস্তিত্ব আছে। কিন্তু জঙ্গি আক্রমণের ভয়ে বিমানবন্দরগুলোয় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করার ঘোষণায় দেশবাসী কিছুটা শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। কারণ আওয়ামী লীগ আমলে জঙ্গি নাটকের বেদনাদায়ক ঘটনাবলি সহজে ভুলে যাওয়ার নয়।
এছাড়া বর্তমান সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যকার সম্পর্কের অবনতিও জনগণের মধ্যে এক ধরনের হতাশা সৃষ্টি করেছে। দেখেশুনে মনে হচ্ছে একদার মিত্ররা এখন একে অন্যের শত্রুতে পরিণত হচ্ছে । বাংলাদেশের অতীত রাজনীতির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, চরম শত্রু যেমন মিত্রে পরিণত হয়েছে, তেমনি শত্রু হতেও তেমন সময় লাগেনি। অতীতের এই ঘটনাবলি পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাব, কীভাবে আমাদের রাজনীতি পর্যায়ক্রমে আবর্তিত হয়ে আসছে।
কিন্তু শুরু থেকেই ৮৮ আসনপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের অসহযোগিতা এবং ১৯৯৩ সালের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা ত্রিমুখী রাজনৈতিক মেরূকরণের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। রাজশাহী ঘটনার পর জামায়াতে ইসলামী বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে চলে যায় এবং পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনের সূচনা করে, যা জ্যামিতির ত্রিভুজ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটায়। যেটা আমরা এখন আবার দেখতে পাচ্ছি। আর এই পরিস্থিতির সম্পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ। অর্থাৎ আন্দোলনের একপর্যায়ে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করে দেয়, যার ফলে সরকার কোণঠাসা হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংযোজন করতে বিএনপি সরকার বাধ্য হয়, যা পরে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাওয়ার পথকে শুগম করে দেয়। তাই আমরা দেখতে পাই, ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়।
এখানে উল্লেখ করতে হয়, আশির দশকে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, সে সময়ই মূলত তিনটি রাজনৈতিক শক্তির অস্তিত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে । কারণ ১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেনারেল এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি ১৫৩টি আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলেও স্বাধীনতার পর এই প্রথম জামায়াতে ইসলামী স্বীয় নামে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১০টি আসন লাভ করে, যা দলটির রাজনৈতিক শক্তি সঞ্চয়ের ইঙ্গিত বহন করে। এর আগে ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত নেতারা ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ নামে একটি দল গঠন করে মুসলিম লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল এবং এই জোট ২০টি আসনে বিজয়ী হয়ে চমক দেখিয়েছিল। যাই হোক ৮৬ সালের নির্বাচনে দেশের অন্যতম বৃহত্তর দল বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি। আর সে সময় রাজনৈতিক মেরূকরণ ছিল এ রকম—এরশাদ রেজিম, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দলের জোট, বিএনপি নেতৃত্বে সাত-দলীয় জোট, আলাদাভাবে জামায়াতে ইসলামী ও বামপন্থিদের একটি পাঁচ-দলীয় জোট ছিল। মোটা দাগে একদিকে বিএনপি জোট, জামায়াতসহ ইসলামি মূল্যবোধ সম্পন্ন রাজনৈতিক দলগুলো এবং অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ভারতপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর মেরূকরণ।
আর এই মেরূকরণের ভিত্তিতেই ২৪-এর গণবিপ্লব সংগঠিত হয় এবং শেখ হাসিনার নিবর্তনমূলক শাসনের অবসান ঘটে। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বিশেষ করে, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এবং তার মিত্রদের অনুপস্থিতির কারণে একদার জোটের শরিক দলগুলো পরস্পরবিরোধী অবস্থান থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় যে বৈরিতা দেখা গিয়েছিল, তা এখন শত্রুতায় রূপ নিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে এখন দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে তিনটি রাজনৈতিক শক্তির মেরূকরণ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ একদিকে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে একটি জোট, ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতৃত্বে একটি ও জামায়াতের নেতৃত্বে ১১-দলীয় জোট। কথায় বলে, মিত্র শত্রু হলে ভয়ংকর শত্রু হয়। যেমনটা আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। দীর্ঘদিন এ দুটি দল একসঙ্গে একই জোটে থেকে রাজনীতি করেছে। এখন তারা পরস্পর শত্রু হয়ে উঠেছে বলে মনে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আবার আমরা জ্যামিতির সেই ত্রিভুজ পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছি। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এই পরিস্থিতিটা এখন রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ ক্ষেত্রে যদি নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতারা জামায়াতে ইসলামীকে কোণঠাসা করতে বিএনপিকে মদত দেয় এবং বিএনপিও যদি একইভাবে চিন্তা করে, তাহলে নিঃসন্দেহে আগামী দিনের রাজনীতি বেশ ইন্টারেস্টিং হয়ে উঠবে। কারণ বিএনপির মধ্যে অনেকেই এমন আছেন, যারা জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত ১১-দলীয় জোটকে প্রিন্সিপাল অ্যানিমি হিসেবে দেখার চেষ্টা করছে এবং সে ক্ষেত্রে তারা আওয়ামী লীগের সহায়তা নিতেও দ্বিধাগ্রস্ত নয় বলে মনে হচ্ছে। প্রাইভেটলি আলোচনাকালে অনেকে তো বলেও থাকেন। সুতরাং ক্ষেত্রে ত্রিভুজের দুই কোণ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একত্র হলে নিঃসন্দেহে জামায়াতে ইসলামী কোণঠাসা হয়ে পড়বে।
কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আওয়ামী লীগ নেতারা জামায়াত জোটকে চিরকালের জন্য শত্রুতায় পরিণত করতে বিএনপিকে সহযোগিতা করলেও মূলত আওয়ামী লীগের ‘প্রিন্সিপাল অ্যানিমি’ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলই (বিএনপি)। কারণ এই দলটিই মূলত আওয়ামী লীগের ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী, জামায়াত নয়। এখানে উল্লেখ করতে হয়, আওয়ামী লীগ জামায়াতে ইসলামীকে স্বাধীনতাবিরোধী বললেও ৯৬ সালে ঠিকই বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত হতে সামান্য দ্বিধা করেনি। এমনকি ৯৬ সালে আওয়ামী লীগের মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন পেতে শেখ হাসিনা জামায়াতে ইসলামীর আমির গোলাম আজমের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। শুধু তাই নয়, বিএনপি সরকারকে আরো কোণঠাসা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করতে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী একযোগে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। সুতরাং আবার যে নতুন একটা প্রেক্ষাপটে ওই ধরনের জোট হবে না, এমনটা হলফ করে কারো পক্ষে বলা সম্ভব নয়। সুতরাং বিএনপির মধ্যে যারা ভাবছেন, জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত করতে প্রয়োজনে আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নেবেন, তারা ভুল চিন্তা করছেন। আপাতত এ ব্যাপারে সফল হলেও, ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের মূল টার্গেট হবে বিএনপি। সে ক্ষেত্রে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ জামায়াতকে সঙ্গে নিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
পরিশেষে এ রকম নানা কথার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, জুলাই বিপ্লব-উত্তর বর্তমান সংসদ যদি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে জাতিকে। অন্যদিকে বিএনপির ওপর নেমে আসবে মহাবিপর্যয়। তাই বিরোধী দলকে আস্থায় নিয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ঐতিহাসিক দায়িত্বs এখন ক্ষমতাসীন বিএনপির ওপর পতিত হয়েছে। একইভাবে বিরোধী দলকেও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে। সেটা করতে ব্যর্থ হলে বিরোধী দলেরও দায় এড়ানোর সুযোগ থাকবে না।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক