উচ্ছেদের শঙ্কায় শতাধিক পরিবার
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার আলমবিদিতর ইউনিয়নে তিস্তা সেচ খাল সংস্কার ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ায় শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে। প্রায় ৩৫ বছর আগের সমীক্ষার ভিত্তিতে ১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পকে ঘিরে এলাকায় চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
জানা গেছে, ২০২২ সালে দ্বিতীয় ধাপে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মূল সমীক্ষা করা হয়েছিল প্রায় ৩৫ বছর আগে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিস্তা সেচ প্রকল্পের কার্যকারিতা অনেকটাই কমে গেছে। ২০১৬ সালে ৮৪ হাজার ৩৭৮ হেক্টর জমিতে সেচের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাস্তবে তা নেমে আসে প্রায় ১০ হাজার হেক্টরে। সর্বশেষ ২০২৬ সালে সেচের আওতা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৭ হাজার হেক্টরে, যা এখনো লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম।
সরেজমিনে ব্রহ্মোত্তরপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের দুই পাশ দিয়ে ক্যানেল সম্প্রসারণের কাজ চলছে। কয়েক প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা এসব বসতি এখন উচ্ছেদের মুখে পড়েছে। তিস্তা সেচ ক্যানেলের সম্প্রসারিত অংশ নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে সীমানা নির্ধারণ করে বাড়িঘর সরানোর নোটিশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানে বসবাস করছেন। হঠাৎ করে উচ্ছেদের নোটিশ পেয়ে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
গ্রামের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, আমার বাপ-দাদার আমল থেকে এই ভিটাতেই আছি। এখন এসে আমাকে বলা হচ্ছে বাড়ি ভাঙতে, জায়গা ছেড়ে দিতে! আমরা কোথায় যাব? আমাদের তো আর মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই নেই।
আব্দুল কুদ্দুস বলেন, আমরা তো অবৈধ নই ভাই। টাকা দিয়ে জমি কিনে এই ঘর করেছি। যদি আগে থেকেই অধিগ্রহণ থাকত, তাহলে এত বছর কেউ কিছু বলল না কেন? এখন হঠাৎ এসে বলে উঠে যেতে আমরা যাব কোথায়? এই কথা শুনলেই বুকটা কেঁপে ওঠে।
আলমবিদিতর ইউপি সদস্য খোরশেদ আলম বলেন, এই সেচ ক্যানেল আমাদের প্রয়োজন নেই। বিষয়টি জানিয়ে আমরা গণস্বাক্ষরসহ ডিসি অফিসে অসংখ্য দপ্তরে আবেদন দিয়েছি। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করা হলে এলাকায় বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হবে।
তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানি বলেন, তিস্তা নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে শুধু ক্যানেল সম্প্রসারণ করে কোনো লাভ হবে না। ৩০-৩৫ বছর আগের সমীক্ষা দিয়ে বর্তমান বাস্তবতায় প্রকল্প বাস্তবায়ন যথাযথ নয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার জানান, আমি পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাগজপত্র দেখেছি। সেখানে দেখা যায়, এসব জমি ৯০-এর দশকে অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের পক্ষ থেকেও অভিযোগ রয়েছে যে অনেকেই সেই সময় ক্ষতিপূরণ পাননি বা বিষয়টি তারা জানতেন না। বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি।
অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, এই জমিগুলো ১৯৮০-৯০ দশকে সরকারি নিয়মে অধিগ্রহণ করা হয়েছিল এবং সে সময় ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়েছে। পরবর্তীতে কিছু মানুষ সেখানে বসতি গড়ে তুলেছেন। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বৃহৎ জনগোষ্ঠী সেচ সুবিধা পাবে।
একদিকে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা, অন্যদিকে শতাধিক পরিবারের ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্ক, তিস্তা সেচ প্রকল্প এখন গঙ্গাচড়ার মানুষের কাছে আশীর্বাদ না অভিশাপ, সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে স্থানীয়দের মনে।
এআরবি