কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটের কাছে অপরাধের কথা স্বীকার করলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো উচিত কি না, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ ধরনের তথ্য পুলিশকে জানাতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক কোনো আইন বা নীতিমালা না থাকায় বিষয়টি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে এআইয়ের কাছে অপরাধের স্বীকারোক্তি এবং সেসব কথোপকথন তদন্তে ব্যবহারের ঘটনাও বাড়ছে।
বিশ্বজুড়ে দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে এআই চ্যাটবট। বহু মানুষ এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। তবে কখনো কখনো এর অপব্যবহার এবং অপরাধসংক্রান্ত কথোপকথনও আলোচনায় আসছে।
গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী চ্যাটজিপিটিকে জানায়, গভীর রাতে ক্যাম্পাসে পার্ক করা ১৭টি গাড়ি ভাঙচুর করেছে সে। এরপর সে জানতে চায়, ‘আমাকে কি জেলে যেতে হবে?’
পুলিশের নথি অনুযায়ী, চ্যাটজিপিটি তাকে ধরা পড়লে সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে কিছু পরামর্শ দেয়। তবে তার বার্তাগুলো ক্রমেই আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলে চ্যাটবটটি তাকে জরুরি নম্বর ৯১১-এ ফোন করার পরামর্শ দেয়।
পরে তদন্তকারীদের নিজের ফোন পরীক্ষা করার অনুমতি দেয় ওই শিক্ষার্থী। সেখান থেকে চ্যাটজিপিটির সঙ্গে তার কথোপকথনের ইতিহাস উদ্ধার করা হয়। আদালতে এসব কথোপকথন প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যা তার বিরুদ্ধে গুরুতর সম্পত্তি বিনষ্টের অভিযোগ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ফ্লোরিডায়ও একই ধরনের আরেকটি ঘটনা সামনে এসেছে। আদালতের নথি অনুযায়ী, গত এপ্রিলে দুই কলেজশিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন আগে তাদের রুমমেট চ্যাটজিপিটিকে প্রশ্ন করেছিল, ‘কোনো মানুষকে কালো আবর্জনার ব্যাগে ভরে ময়লার পাত্রে ফেলে দিলে কী হয়?’ পরে ওই দুই শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এদিকে কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রাদেশিক সরকার চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে করা এ মামলার সঙ্গে একটি স্কুলে বন্দুক হামলার ঘটনা জড়িত। ওই হামলায় অধিকাংশই শিশু—এমন নয়জন নিহত এবং ২৭ জন আহত হয়েছিল।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, হামলাকারীর সঙ্গে চ্যাটজিপিটির কথোপকথনের তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানায়নি ওপেনএআই। প্রতিষ্ঠানটি পুলিশকে সতর্ক করলে হামলাটি ঠেকানো সম্ভব হতে পারত বলেও দাবি করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যান এক চিঠিতে ক্ষমা চেয়েছেন। তবে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে কয়েকজন তথ্য ফাঁসকারী জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের জুনেই হামলাকারীর সঙ্গে চ্যাটজিপিটির কথোপকথন সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। তাদের দাবি, পুলিশকে জানানোর বিষয়ে নিরাপত্তা দলের সুপারিশ নাকচ করে দেন অল্টম্যান ও প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
এআই চ্যাটবটের সঙ্গে এ ধরনের কথোপকথনের নৈতিক ও আইনি দিক আরো জটিল হয়ে উঠছে। অস্ট্রেলিয়ার একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের মধ্যে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনা দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় অনলাইনে চ্যাটবটের কাছে প্রকাশ করার প্রবণতা বেশি।
আইনজীবী ও মক্কেলের কিংবা চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যকার কথোপকথনের ক্ষেত্রে যে গোপনীয়তার নীতি প্রযোজ্য, এআই চ্যাটবটের সঙ্গে ব্যবহারকারীর কথোপকথনের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। ফলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তদন্তের প্রয়োজনে এসব কথোপকথনের তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিতে পারে।
চ্যাটবটের কাছে অপরাধের স্বীকারোক্তি পেলে সেগুলো পুলিশকে জানানো উচিত কি না, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক চলছে। তবে এআইয়ের অ্যালগরিদম অনেক সময় ব্যবহারকারীর বক্তব্যের উদ্দেশ্য ভুলভাবে বুঝতে পারে। ফলে এ ধরনের বাধ্যবাধকতা কার্যকর করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এর উদাহরণ হিসেবে গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা সামনে এসেছে। সে সময় অ্যানথ্রপিকের ক্লড ৫ নামের এআই চ্যাটবট একটি অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়ে পুলিশের হটলাইনে অভিযোগ জানিয়েছিল। এ ধরনের ঘটনা অপরাধ শনাক্তের ক্ষেত্রে এআইয়ের ভূমিকা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি