বৃহত্তর বাংলায় রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার সূচনা হয়েছিল সোয়া আটশ বছর আগে, মুহাম্মাদ বখতিয়ার খলজির হাত ধরে। তিনি বাংলার মানুষের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কোনো ধরনের রক্তপাত ছাড়া বাংলার মসনদ অধিকার করে নিয়েছিলেন। প্রশ্ন হলো বাহ্যিক দৃষ্টিতে অবিশ্বাস্য এ কাজটি তিনি এত সহজে কীভাবে সম্পন্ন করেছিলেন?
বখতিয়ার যখন বাংলায় অভিযান পরিচালনা করতে আসেন, তখন শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল বহিঃবাংলার শাসকগোষ্ঠী সেন রাজবংশ। তারা এসেছিল দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে। স্থানীয় শাসকগোষ্ঠী বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী পালদের অপসারণ করে তারা ক্ষমতা দখল করে। ক্ষমতায় আরোহণের পর থেকে বিভিন্ন প্রজাদের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বাড়তে থাকে।
স্থানীয় ধর্মমতের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের মধ্যে ধীরে ধীরে বিরোধ, দূরত্ব ও ঘৃণা সঞ্চারিত হতে থাকে। আর স্বতঃসিদ্ধ নীতি হলো, জুলুম ও জালেমের ক্ষমতা কখনো স্থায়ী হয় না। ফলে সেনদের জোর-জুলুম, নির্যাতন-অবিচারই সাধারণ মানুষের কাছে অপরিচিত ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বখতিয়ারের ক্ষমতারোহণকে সহজ করে তুলেছিল।
সেনরাজরা ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই পুরো সমাজব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করে। নিজেদের মনগড়া সংস্কার জনতার ওপর চাপিয়ে দিতে থাকে। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও সমাজব্যবস্থার গতিপথ পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। তারা বাংলার মানুষের স্বাভাবিক জীবনবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। আর মানুষ তার স্বভাবপ্রকৃতি-বিরুদ্ধ ধর্ম, মত, সমাজ ও শাসনকে কখনোই স্থায়ী ও আন্তরিকভাবে মেনে নেয় নি।
জনমানুষের মুখের ভাষায় সেনদের হস্তক্ষেপ
বাংলার মানুষের ওপর সেনদের চাপিয়ে দেওয়া ধর্ম, মত ও সামাজিক রীতিনীতি কেমন ছিল? ইতিহাসের পাতা ওলটালে দেখা যায়, সেনরাজারা মানুষের মুখের কথার ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। বরং মৌখিক ভাষা পরিবর্তনের বিধিনিষেধ আরোপের মধ্য দিয়েই তাদের শাসন শুরু হয়। পারস্পরিক বোঝাপড়া কোন মাধ্যমে হবে, কোন ভাষায় মনের কথা ব্যক্ত করা যাবে, কোন বাক্যে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা করা নিষিদ্ধ—তা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। ফলে শাসনের শুরুতেই সেনদের বিষয়ে মানুষের মনে আতঙ্ক ঢুকে যায়।
পাল বংশের শাসনামলে বাংলার মানুষ স্থানীয় ভাষা বাংলায় ধর্মীয় অনুষঙ্গ, সামাজিক রীতিনীতি ও সাহিত্যচর্চা করত। তখন রাষ্ট্র এবং জনমানুষের ভাষা ছিল বাংলা। শাসকরা এ ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। (বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের অবদান, পৃ. ৫১) ফলে শাসক ও প্রজাসাধারণের মধ্যে এক ধরনের সেতুবন্ধ ছিল। সেনরা ক্ষমতা গ্রহণের পর এই বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়। তাদের কাছে বাংলা হয়ে ওঠে অপবিত্র, অচ্ছুৎ ও নিম্নবর্ণের মানুষের মুখের ভাষা। শাসকরা সংস্কৃতকে মহাপবিত্র ও দেবতার ভাষা হিসেবে আখ্যায়িত করে। তারা উচ্চবর্ণের হিন্দু ব্রাহ্মণদের দিয়ে বিধান আরোপ করে যে, মানবরচিত ভাষায় যারা পুরাণ ও রামায়ণ শ্রবণ করবে, তাদের স্থান হবে রৌরব নরকে। (প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫)
গৌতম ঘোষদস্তিদার বলেন, ‘তারা উচ্চকোটির সংস্কৃত ভাষা-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তারা তথাকথিত শূদ্র শ্রেণিকে শাস্ত্রপাঠ ও শ্রবণের অধিকার দেননি। সেন আমলে স্বভাবতই বাংলায় কোনো সাহিত্য-সৃষ্টি সম্ভব হয়নি। সংস্কৃত ছাড়া অন্য ভাষাকে সেনরাজারা ঘৃণার চোখে দেখতেন। তারা মনে করতেন, বাংলায় পুরাণ বা শাস্ত্রগ্রন্থ অনূদিত হলে তা অপবিত্র হয়ে যাবে।’ (বঙ্গবিজেতা বখতিয়ার, পৃ. ৯৩-৯৪)
ড. দীনেশচন্দ্র সেন দাবি করেছেন, প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে সেনদের সম্পর্কে একটি ছড়াও নেই; অথচ রয়েছে পালদের স্তুতিগান। এমনকি সেকালের সাহিত্যে তাদের কোনো উল্লেখ নেই বললেও অত্যুক্তি হবে না। তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, প্রজাসাধারণ সংস্কৃত ভাষায় অনাচারণীয় ও অনভিজ্ঞ ছিল। তাহলে রাজপ্রাসাদে কিংবা রাষ্ট্রকল্পে তারা ঢুকবে কীভাবে? (বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের অবদান, পৃ. ৪৮)
ফলে স্বভাবতই রাজা ও প্রজার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। জমা হতে থাকে ক্ষোভ, সৃষ্টি হতে থাকে বিক্ষোভ। মানুষের সামাজিক জীবন হয়ে ওঠে অমসৃণ, পিচ্ছিল ও দুর্বিষহ। তাদের স্বাভাবিক ধর্মকর্ম ও পালিত রীতিনীতি বাধাগ্রস্ত হতে থাকে।
ধর্মীয় মতাদর্শে হস্তক্ষেপ
আদিকাল থেকেই বাংলার মানুষ নিজ ধর্মের প্রতি অত্যন্ত দুর্বল। ফলে তারা ধর্মীয় আচার-আচরণে অন্য কারো অন্যায় হস্তক্ষেপ কখনোই মেনে নেয়নি। কিন্তু সেন শাসকরা স্থানীয় প্রজাসাধারণের ধর্মীয় জীবনে হস্তক্ষেপ করে এবং নিজেদের পছন্দমতো ধর্মমতকে তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তারা ছিলো ক্ষত্রিয়-ব্রাহ্মণ; প্রথমে ব্রাহ্মণ এবং পরে শাসনভার পরিচালনার নিমিত্তে ক্ষত্রিয়দের গ্রহণ করে নেয়। ফলে তারা সামাজিকভাবেও ব্রাহ্মণ্যবাদী মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। যেহেতু এই অঞ্চলে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রভাব ছিল না, তাই শাসকগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিদেশি ‘কনোজিয়া ঠাকুর’দের আমদানি করতে হয়েছিল। (প্রাগুক্ত, পৃ. ২৪) এই ঠাকুরদের প্রভাবে হিন্দুদের সঙ্গে বৌদ্ধ ও মুসলমানদের ধর্মের লোকদের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে জনসাধারণের মনে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। অথচ সেকালে বাংলায় বৌদ্ধরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ।
শৈলেন্দ্র কুমার ঘোষ দাবি করেছেন, সেন শাসনের আগে পুরো ভারতে একটি মাত্র দুর্গা মন্দির ছিল; তাও সেটি সেনরাজাদের পূর্বপুরুষের আবাসস্থল কর্ণাটকে। (গৌড় কাহিনি, পৃ. ২৯৯) তারা ক্ষমতাকে ব্যবহার করে এটিও বাংলায় আমদানি করে এবং প্রজাসাধারণকে সেখানে পূজার্চনা করতে বাধ্য করেন। ড. দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান বড়ুয়ার উল্লেখে জানা যায়, ‘বর্মণ-সেন বংশীয় রাজন্যবর্গের বিদ্বেষপূর্ণ বিরোধিতার কারণে বৌদ্ধধর্মের শেষ আশ্রয়স্থল বাংলাদেশ থেকেও তিরোহিত হতে বাধ্য হয়। সচেতন প্রচেষ্টায় বৌদ্ধধর্ম, বৌদ্ধবিহার ও বৌদ্ধমূর্তি হিন্দু ধর্মে বিলীন হয়ে যায়। এ সময়ে তারা শুধু বৌদ্ধদের অত্যাচার ও তাদের ধর্ম নষ্ট করে ক্ষান্ত হননি। তারা এতকালে সঞ্চিত বৌদ্ধ ভান্ডারের সর্বৈব লুণ্ঠন করে লুণ্ঠিত দ্রব্যে ওপর নিজেদের নামাঙ্কের ছাপ দিয়ে সামগ্রিকভাবে সর্ববিধ নিজস্ব করে নেয়। হিন্দুদের পরবর্তী ন্যায়, দর্শন, ধর্মশাস্ত্র ইত্যাদির মধ্যে এ লুণ্ঠনের পরিচয় পাওয়া যায়।’ (বঙ্গবিজেতা বখতিয়ার, পৃ. ৯১)
শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় উচ্চশ্রেণির হিন্দু ধর্মীয় পণ্ডিত ও ব্রাহ্মণরা সাধারণ মানুষের সম্পদের দখলদার হয়ে ওঠে। (প্রাগুক্ত, পৃ. ৯২) ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধরা হয় নির্যাতিত, নিপীড়িত ও নিগৃহীত। ড. দীনেশচন্দ্র সেন লিখেছেন, ‘বঙ্গদেশ হইতে বৌদ্ধগণ তাড়িত হইলে তাহাদের নেতৃগণের একদল তিব্বত ও নেপালের উপত্যকা ভূমিতে পলাইয়া যান, অপর দল চট্টগ্রামের পূর্ব্বে আরাকান ও ব্রহ্মদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেন, সেই প্যাগোডা ও ফুঙ্গীর দেশে বঙ্গীয় বহু বৌদ্ধ আড্ডা স্থাপন করিয়াছিলেন। ইহারা বহু বিদ্যায় পারদর্শী ও কৃতী ছিলেন। তাহারা বাঙ্গলা ভাষার আদর করিতেন ও তাহার চর্চ্চা জনসাধারণের মধ্যে বিষদভাবে প্রচলিত করিয়াছিলেন। পূর্ব্বে একস্থানে লিখিত হইয়াছেÑআরাকান রাজাদের অধিকার একসময়ে ঢাকা হইতে পেগু পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ইহাদের অধিকারে চট্টগ্রামে এবং তদুপান্তে অধিকাংশ লোকই বৌদ্ধ ছিল। পরবর্তী যুগে এই সকল প্রদেশে এক সুবৃহৎ সংখ্যক অধিবাসী ইসলাম ধৰ্ম্ম অবলম্বন করিল। এইভাবে তথায় কতক লোক বৌদ্ধ রহিয়া গেল এবং অপরাংশ ইসলাম গ্রহণ করিল।’ (বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের অবদান, পৃ. ৫১)
এভাবে সেন আমলে সামাজিকভাবে নিজস্ব ধর্মমত পালনেও বাধা সৃষ্টি করা হয়। মানুষ স্বাধীনভাবে নিজস্ব ধর্ম, আচার-আচরণ ও কৃষ্টি-সংস্কৃতি ধারণ করতে পারতো না। ব্রাহ্মণ্য হিন্দু-গোষ্ঠী ছাড়া সব ধর্মমত ছিল অত্যাচারিত ও নিগৃহীত।
ব্রাহ্মণ্যবাদ ও জাতিভেদ প্রথা
সেন শাসনামলের সমাজব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যই ছিল ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রবল প্রাধান্য। পাল যুগে যেখানে বিভিন্ন ধর্মমতের মধ্যে সহনশীলতা ও সমন্বয়ের মনোভাব দেখা গিয়েছিল, সেন যুগে সেখানে বৈদিক আচারকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়। সমাজে ব্রাহ্মণদের সর্বোচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত করা হয় এবং নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। সামাজিকভাবে তারা প্রভুত্বের মর্যাদায় আরোহণ করে। তাদের মাধ্যমে প্রজাসাধারণকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং কঠোরভাবে দমন-পীড়ন চালানো হয়। বল্লাল সেনের সময় কুলীন প্রথার প্রবর্তন সমাজে জাতিগত বিভাজনকে আরো তীব্র করে তোলে। ব্রাহ্মণদের বিভিন্ন কুলে বিভক্ত করা হয়। অব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রেও অসংখ্য উপশ্রেণি তৈরি করা হয়। ফলে সমাজে উচ্চ, মধ্য ও নিম্ন শ্রেণির বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নিম্নবর্ণের মানুষের সামাজিক মর্যাদা ছিল অত্যন্ত নীচু; উচ্চবর্ণের সঙ্গে তাদের সামাজিক সম্পর্ক প্রায় নিষিদ্ধ ছিল। ব্রাহ্মণ ছাড়া বাকি সব মানুষকে প্রথমে ৩৬ ভাগে ভাগ করা হয়। এরপর আরো ৫টি বাড়িয়ে ৪১টি শ্রেণি করা হয়। এরপর ৪১টি শ্রেণিকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করে ২০টিকে উত্তম, ১২টিকে মধ্যম এবং ৯টিকে নিম্নশ্রেণি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এর মধ্যে সর্বোত্তম শ্রেণি বানানো হয় ব্রাহ্মণদের। এভাবে সমাজে মানুষে মানুষে বিভেদ, বন্ধনহীনতা ও পেশাভিত্তিক বিভক্তি তৈরি করা হয়। (বাংলাদেশ ও ইসলাম : আত্মপরিচয়ের ডিসকোর্স, পৃ. ৮৫)
শূদ্র বা চণ্ডাল শ্রেণির কেউ শহরে প্রবেশ করতে হলে ঘণ্টাধ্বনি দিতে হতো, যেন ব্রাহ্মণদের মুখদর্শন না হয়। ব্রাহ্মণদের সামনে বসলে তাদের নিতম্বের মাংস কেটে নেওয়া হতো। (ইখতিয়ারউদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজি, পৃ. ৭৫)
এ ধরনের শ্রেণিভেদের ফলে ব্রাহ্মণরা হয়ে ওঠে পূজনীয় রাজপুরুষ। আর অন্যরা দাস। রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে তারা বিশাল বিশাল জমিদার বনে যায়। অথচ সাধারণ জনগণের ছিল না খাওয়া-পরা কিংবা স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার। সম্পত্তিতে নারীদের কোনো রকম অধিকার ছিল না। সহমরণ প্রথা ছিল ধর্মীয়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর বিষয়। সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারীদের কেউ যদি সহমরণে না যেত, পরে তার আর বিয়ের সুযোগ থাকত না। সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারতো না। এভাবে সেনযুগে সমাজে নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করে মানুষকে মৌলিক ধর্মবিশ্বাস, অধিকার ও স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল।
নৈতিকতা ও সামাজিক আচরণ
সেন শাসনামলে একদিকে কঠোর ধর্মীয় বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও, অন্যদিকে সমাজে ব্যাপকভাবে নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্রও পাওয়া যায়। অভিজাত শ্রেণির ভোগবিলাস, রাজসভায় বিলাসিতা এবং দেহজীবী নারীদের উপস্থিতি সমাজের এক বৈপরীত্যপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরা হয়। গণিকা ও বেশ্যা প্রথার প্রসার ছিল; বিশেষত গণিকারা ছিল সমাজের উচ্চস্তরে সমাদৃত। এতে বোঝা যায়, বাহ্যিকভাবে ধর্মীয় কঠোরতার মধ্যেই অভিজাত সমাজে বিলাসী জীবনযাপন প্রচলিত ছিল। অশ্লীলতা, অনাচার ছিল নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। পুরুষরা পরত ধুতি আর নারীরা শাড়ি। তবে ঊর্ধ্বাংশ নয় শুধু দেহের নিম্নাংশ আবৃত রাখার সুযোগ ছিল তাদের। নারীর বক্ষ খোলা থাকত সর্বদা। এমনকি সম্ভ্রান্ত নারীরাও রাজপথে দোলায় আরোহণকারী শহুরে পুরুষদের সঙ্গে রসালো প্রেমালাপে রাত কাটাত। রাজা ও রাজদরবারের পুরুষরাও গণিকাদের সান্নিধ্য গ্রহণ করত। (বঙ্গবিজেতা বখতিয়ার, পৃ. ৯১ )
সেন শাসনামলে একদিকে ধনিকশ্রেণি ডুবে ছিল বিলাসিতা, অশ্লীলতা ও দরিদ্র-শোষণকার্যে, অন্যদিকে দরিদ্রশ্রেণির ছিল না মৌলিক অধিকার ও ন্যূনতম স্বাধীনতাও। ফলে সমাজে বৈষম্যের এক কঠোর দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হতে থাকে। জনমানসে জ্বলতে থাকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। এটি শুধু বশাল আকার ধারণ করে ছড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায় ছিল। সময়-সুযোগ পেয়ে তা শাসকগোষ্ঠীকে গ্রাস করতে উদ্গ্রীব হয়ে ছিল।
বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনিক প্রভাব
সেনযুগে ন্যায়বিচার পাওয়া ছিল আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতোই অসাধ্য। কখনো কখনো সুবিচার চাওয়াকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো। এ ক্ষেত্রে নজির হিসেবে দুটো ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে।
রাজা লক্ষ্মণ সেনের স্ত্রী ছিলেন রাজরানি বল্লভা। তার ছোট ভাই কুমার দত্ত এক বণিকের স্ত্রী মাধবী নামের নারীকে নির্যাতন করে। নির্যাতিত মাধবী আত্মসম্মান ক্ষুণ্ণ করে সুবিচারের আশায় রাজদরবারের দ্বারস্থ হন। রানি বল্লভা নিজেও রাজসভায় উপস্থিত ছিলেন। লক্ষ্মণ সেন মাধবীর অভিযোগ শুনে নিরুত্তর থাকল আর রাজমহিষী স্বয়ং মাধবীকেই অভিযোগ করার অপরাধে প্রহারে প্রহারে জর্জরিত করলেন। (বাংলাদেশ ও ইসলাম : আত্মপরিচয়ের ডিসকোর্স, পৃ. ৮৯)
গঙ্গার তীরে এক নারীর গলার হার রানি বল্লভার দৃষ্টি কাড়ল। সে হারটির প্রশংসা করলেন। প্রশংসার ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট। কিন্তু সেই নারী হারটি রানিকে দিলেন না। ফলে হারটি জোরপূর্বক নিয়ে নিলেন। রাজার নামে যখন-তখন মনমতো আদেশ জারি করতে পারতেন এই রাজমহিষী। তাকে বারণ করার কেউ ছিল না। কোনো যুবতীকে রাজার শ্যালক কুমারদত্তের পছন্দ হলে তিনি তাকে অপহরণ করতে চাইতেন। এর জন্য কোনো ধরনের বিচার চাওয়া যেত না। এ জন্যই শৈলেন্দ্র কুমার ঘোষ মন্তব্য করেছেন, ‘নবদ্বীপ পতনের পর তাদের অনেকে বখতিয়ার ও তার অনুচরবর্গকে নিজেদের ত্রাণকর্তা বলে গ্রহণ করে।’ (গৌড় কাহিনি, পৃ. ৩৬৪-৩৬৬)
এভাবে সমাজে যখন নৈতিক অবক্ষয়, অনাচার, বিচারহীনতা, অত্যাচার, নির্যাতন, শ্রেণিবিভেদ, অশ্লীলতা, দুর্নীতি, জনসাধারণের সমর্থনবিহীন মেরুদণ্ডহীন সরকারব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, তখনই এসেছিলেন বখতিয়ার খলজি। সমাজ-সভ্যতার চরম অধঃপতনের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে উপনীত হয়েছিল সামাজিক অবস্থা। মুক্তিকামী মানুষ তাকিয়ে ছিল একজন উদ্ধারকর্তার দিকে। এমন সময় ত্রাণকর্তা হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন তরুণ তুর্কি বখতিয়ার। ফলে নীহাররঞ্জন রায়ের লেখায় দেখা যায় আক্ষেপÑ‘একটা বৃহৎ গভীর সামাজিক বিপ্লবের ভূমি পড়িয়াই ছিল, কিন্তু কেহ তার সুযোগ গ্রহণ করে নাই। মুসলমানেরা না আসিলে কী উপায়ে কী হইতো বলিবার উপায় নাই।’ (বাংলাদেশ ও ইসলাম : আত্মপরিচয়ের ডিসকোর্স, পৃ. ৮৯)